ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সংঘাতকে আঞ্চলিক রূপ দিয়েছে ইরান। এতে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সাময়িকী দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত ‘কৌশলগত গলিপথে’ পরিণত হয়েছে। এই সংকীর্ণ পথের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক মাসের জন্যও স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট এই সাময়িকী প্রকাশ করে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে প্রণালিটি কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে বীমা ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে এবং বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ওমান উপকূলের কাছে স্কাইলাইট, এমকেডি ভিওম ও হারকিউলিস স্টারসহ অন্তত ২০টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা তেল বাণিজ্য ব্যাহত করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইআরজিসি এই জলপথকে কার্যত মাইনফিল্ডে পরিণত করতে সক্ষম। তাদের কাছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার নৌমাইন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রণালিটি বন্ধ করে দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মাইন অপসারণ। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সীমিত মাইন অপসারণ সক্ষমতা থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। হাজারো মাইন অপসারণ একটি দীর্ঘ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যা চলাকালীন বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে উপসাগর অতিক্রম করাতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরু এই প্রণালিতে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর সমাধান নাও হতে পারে।
এদিকে প্রণালিটি সচল রাখতে ছয়টি পশ্চিমা দেশ সহায়তার আশ্বাস দিলেও তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ইরানের অবস্থান দুর্বল না করা পর্যন্ত সংকট নিরসনের কার্যকর উপায় সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে সীমিত পরিসরে মাইন পাতা শুরু করেছে, যা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এ কার্যক্রম চালানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের জন্য সরাসরি নৌযুদ্ধে জয়লাভ জরুরি নয়। বরং কম খরচের নৌমাইন ব্যবহার করেই তারা বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজগুলোকে কার্যত অচল করে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
পূর্বের পোস্ট :