ইরানে যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই আলাপেই ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে চূড়ান্ত যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝান—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের একযোগে নির্মূল করার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এতে ট্রাম্প ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা তেহরানের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বৈঠকে বসবেন—এমন গোয়েন্দা তথ্য আগেই জানতেন নেতানিয়াহু। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলার একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়। যদিও ইসরায়েল এ ধরনের হামলা চালিয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে এমন পদক্ষেপে সতর্ক।

ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র জানায়, নতুন গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায় বৈঠকটি নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।

প্রতিশোধের যুক্তি সামনে

ফোনালাপে নেতানিয়াহু প্রতিশোধের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেন। তিনি ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেন, অতীতে ইরান একাধিকবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় এক পাকিস্তানি নাগরিকের মাধ্যমে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।

মার্কিন কর্তৃপক্ষ ওই ব্যক্তিকে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। ধারণা করা হয়, ইরানের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ইঙ্গিত দেন, ইরান অভিযানের পেছনে প্রতিশোধ একটি ভূমিকা রেখেছে।

দ্বিধার মধ্যে সিদ্ধান্ত

যদিও ট্রাম্প আগেই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছিলেন, তবে কখন এবং কীভাবে তা শুরু হবে—এ নিয়ে তিনি দ্বিধায় ছিলেন। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছিল।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে সম্ভাব্য একটি হামলার সময় পিছিয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা এবং নতুন গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে বলে মনে করা হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাম্প।

হামলা ও ঘোষণা

পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানে প্রথম হামলা চালানো হয়। সেদিন সন্ধ্যায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন।

নেতানিয়াহু যুক্তি দিয়েছিলেন, খামেনিকে সরিয়ে দিলে ইরানে গণঅসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং ১৯৭৯ সাল থেকে চলা ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আগেই সতর্ক করেছিল, খামেনির মৃত্যু আরও কট্টরপন্থি নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে পারে।

আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি ফোনালাপ নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও জানান, এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করা, নৌক্ষমতা ধ্বংস করা এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার সক্ষমতা কমিয়ে আনা।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বলেছেন—ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে এনেছে, এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। ট্রাম্পও জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ তাঁর নিজের।

বিশ্লেষণ যা বলছে

রয়টার্স সরাসরি বলেনি যে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছেন। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট, তিনি অত্যন্ত কৌশলীভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। বিশেষ করে প্রতিশোধ ও কৌশলগত সুযোগের বিষয়টি ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।