ইরানজুড়ে রাতভর তীব্র বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি যুদ্ধ আরও অন্তত তিন সপ্তাহ বাড়ানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইসরায়েল।

সোমবার দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের জানান, ইরান–এর সঙ্গে চলমান সংঘাত মোকাবিলায় আগামী তিন সপ্তাহের সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তা আরও দীর্ঘায়িত করা হতে পারে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আঘাত হেনে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে তারা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানে এখনও হামলা চালানোর মতো শত শত লক্ষ্যবস্তু রয়েছে।

শোশানি বলেন, “ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে দেওয়ার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে চাই।” ইতোমধ্যে ইসরায়েল ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করেছে।

অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, তেহরান কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র–এর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো বার্তা আদান–প্রদানও হয়নি।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব

ইরানি ড্রোন হামলার মুখে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত–এর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ এই অভিযান এখন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি না দেখা যাওয়ায় এবং বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে নতুন করে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের আহ্বান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি পুনরায় চালু করতে বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গঠনের আহ্বান জানান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ন্যাটো জোটের সদস্যরা যদি ওয়াশিংটনের উদ্যোগে এগিয়ে না আসে, তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ “খুবই খারাপ” হতে পারে।

ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মধ্য ইরানের মারকাজি প্রদেশ–এ রাতভর হামলায় পাঁচজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন।

আরাক শহরের উপকণ্ঠের একটি আবাসিক এলাকা এবং মাহাল্লাত কাউন্টি–র একটি ভবনে হামলা চালানো হয়। এছাড়া খোমেইন শহরের একটি বালক বিদ্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজ শহরে ইরানি শাসনব্যবস্থার অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।

পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক সংঘাত

প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ইসরায়েলের তেল আবিব শহরে ড্রোন ও মিসাইল হামলার দাবি করেছে। তারা আরও দাবি করেছে যে আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি (আবুধাবি) এবং বাহরাইন–এ মার্কিন নৌঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

ফুজাইরাহ বন্দর–এ ইরানি ড্রোন হামলার পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। একই সময় সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা এক ঘণ্টার মধ্যে দেশের পূর্বাঞ্চলে ৩৪টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

লেবানন ও গাজায় অভিযান

এদিকে লেবানন ও গাজা উপত্যকা–তেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ–র অবস্থান লক্ষ্য করে তারা “সীমিত স্থল অভিযান” শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।