প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে চলা যুদ্ধের প্রভাব এবার ভারতের রান্নাঘরেও পৌঁছেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশটিতে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।
এর ফলে ভারতের অনেক রেস্তোরাঁ মেনু ছোট করতে, কাজের সময় কমাতে এবং কোথাও কোথাও ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে রান্নার গ্যাসের ডিলারদের সামনে দীর্ঘ লাইনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বাণিজ্যিক এলপিজি ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে রেস্তোরাঁ মালিকরা।
ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা মনপ্রীত সিং বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রান্নার গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না।” তিনি জানান, দিল্লি থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শহরেই রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেকে কয়লা, কাঠ ও বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে ঝুঁকছেন।
মুম্বাইয়ের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এলপিজি সংকটের কারণে শহরটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, তাদের গ্যাসের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
বেঙ্গালুরুর এক বেকারি মালিক হারুন সাইত বলেন, “আমরা এখন কফি ছাড়া আর কিছুই বানাতে পারছি না। ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।”
সংকট মোকাবিলায় অনেক রেস্তোরাঁ দুপুরের খাবার পরিবেশন বন্ধ করে শুধু রাতের জন্য খোলা রাখছে। অন্যদিকে বাজারে ইলেকট্রিক কুকারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা তা সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সরকারের দাবি ও বাস্তবতা
ভারতে ৩০ কোটিরও বেশি এলপিজি গ্রাহক রয়েছেন। সংকটের মধ্যেও সরকার বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুজাতা শর্মা বলেন, “ভুল তথ্যের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি বুকিং ও মজুত করছে। সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহের চক্র এখনও স্বাভাবিক রয়েছে।”
ভারতের ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয় এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশটির তেল শোধনাগারগুলোকে গৃহস্থালির জন্য এলপিজি উৎপাদন ২৫ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের চেয়ে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প জ্বালানি উৎসের চেষ্টা
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে, ভারতের সামগ্রিক জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে। দেশটি তাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
কেপলারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে তেল আমদানির মাধ্যমে কিছুটা ঘাটতি পূরণ করতে পারে। বর্তমানে ভারত মহাসাগরে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি ব্যারেল রুশ তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা ভারত ও চীনের জন্য বিকল্প উৎস হতে পারে।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরও বলেছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনাকে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়।
আসল সংকট এলপিজি
বিশ্লেষকদের মতে, অপরিশোধিত তেল বা রিফাইন করা জ্বালানি নিয়ে ভারত তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এলপিজি।
ভারত প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল এলপিজি ব্যবহার করে, যার মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। শোধনাগারগুলো উৎপাদন ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ালেও তা মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ করতে পারবে না।
বাকি অংশের জন্য আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, অপরিশোধিত তেলের ঝুঁকি কিছুটা কমানো গেলেও আগামী কয়েক সপ্তাহে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করাই ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এরই মধ্যে বাজারে কালোবাজারি এবং সিলিন্ডার মজুতের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পূর্বের পোস্ট :