সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। শিগগিরই ওমানে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আলোচনা এগোচ্ছে।
গেল মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংস অভিযান চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি বাড়ায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই অভিযানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এরই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হচ্ছে।
আলোচনার স্থান ও পরিসর নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে একপর্যায়ে বৈঠকটি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত আলোচনা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। তবে আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যৎ সংলাপের জন্য একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে হবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পরিত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে আলোচনায় ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, আলোচনা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। এ মতপার্থক্যের কোনো সমাধান হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা চালাতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে।
এর জবাবে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, হামলা হলে তারা শক্ত হাতে জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানবে।
ইরানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের পর এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ইরানের দাবি, ওই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দেশে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ইরানি নেতৃত্বের জন্য এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর শেষ সুযোগ হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে অন্তত ৬ হাজার ৮৮৩ জন নিহত এবং ৫০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
আলোচনায় তেহরান অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলবে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, অর্থবহ অগ্রগতির জন্য আলোচনা অবশ্যই পারমাণবিক ইস্যুর বাইরেও বিস্তৃত হতে হবে।
আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ও বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে। তাদের মতে, কেবল আকাশপথের সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানি নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত আলোচনার ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক কোন পথে মোড় নেয় এবং সামরিক সংঘাতের শঙ্কা কতটা কমে আসে।
পূর্বের পোস্ট :