মিয়ানমারের কারাবন্দি নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নেত্রী অং সান সু চি এখনও বেঁচে আছেন কি না—এ নিয়েই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর ছেলে কিম অ্যারিস। সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রায় চার বছর ধরে মায়ের সঙ্গে কোনো সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় তিনি আশঙ্কা করছেন, হয়তো তাঁর মা আর জীবিত নেই।

ব্রিটিশ নাগরিক কিম অ্যারিস এক বার্তা সংস্থাকে বলেন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি কেবল মাঝেমধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হাতের কিছু তথ্য পেয়েছেন, যেখানে সু চির শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা বলা হয়েছে। এসব তথ্যে হৃদ্রোগ, হাড় ও মাড়ির সমস্যার উল্লেখ রয়েছে।

টোকিওতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যারিস বলেন, “দুই বছরের বেশি সময় ধরে কেউ তাঁকে দেখেনি। তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি, পরিবার তো দূরের কথা। সত্যি বলতে, আমার জানা মতে তিনি হয়তো ইতোমধ্যেই মারা গেছেন।”

এদিকে, মিয়ানমারের সামরিক সরকার চলতি মাসের শেষ দিকে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বড় একটি অংশ এই নির্বাচনকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছে। কিম অ্যারিসও এই ভোটকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি ধারণা করছেন, নির্বাচনের আগে বা পরে সামরিক জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং রাজনৈতিক স্বার্থে সু চিকে ব্যবহার করতে পারেন। অ্যারিস বলেন, “যদি তিনি জনগণের মন পাওয়ার জন্য আমার মাকে মুক্তি দেন বা গৃহবন্দিত্বে পাঠান, তাতেও অন্তত কিছুটা হলেও অগ্রগতি হবে।”

এর আগেও মিয়ানমারের সামরিক সরকার জাতীয় দিবস বা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার সময় প্রভাবশালী বন্দিদের মুক্তি দিয়েছে। অং সান সু চিও ২০১০ সালে সাধারণ নির্বাচনের কয়েক দিন পর, বহু বছর গৃহবন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়েছিলেন। তখন তিনি ইয়াঙ্গুনের ইনয়া লেকের পাশে পারিবারিক বাসভবনে বন্দি ছিলেন।

২০১৫ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে তাঁর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমানে অং সান সু চি উসকানি, দুর্নীতি ও নির্বাচনী জালিয়াতিসহ একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে মোট ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

কিম অ্যারিসের ধারণা, তাঁর মা রাজধানী নেপিদোতে আটক রয়েছেন। প্রায় দুই বছর আগে পাওয়া শেষ চিঠিতে সু চি জানান, কারাগারে কখনো অতিরিক্ত গরম, কখনো তীব্র শীতের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগ হারাচ্ছে বলেও উদ্বেগ জানান অ্যারিস। তিনি বলেন, “মানুষ মিয়ানমারকে ভুলে যাচ্ছে।” তাঁর মতে, রোহিঙ্গা সংকটের পর সু চির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ায় অনেক সরকার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারছে।

সম্প্রতি জাপান সফরে গিয়ে অ্যারিস সেখানকার রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং প্রস্তাবিত নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান।

অ্যারিস বলেন, আসন্ন নির্বাচন তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং মিয়ানমারের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংকটের দিকে আবারও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের একটি সাময়িক সুযোগ তৈরি করেছে।