জ্বালানি সংকটের মধ্যে গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। তীব্র গরমে শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনপদের মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ মিলেছে।
শহরে যেখানে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, সেখানে মফস্বল ও গ্রামে পরিস্থিতি আরও নাজুক। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, পোল্ট্রি, মৎস্য ও শিল্প খাতে; বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট ও বাঁশখালীর এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্রামে বেশি ভোগান্তি
লোডশেডিং সামাল দিতে গিয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে গ্রামীণ এলাকা। অনেক জায়গায় চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
কক্সবাজারের টেকনাফে কোনো কোনো দিন ১২-১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শাহ পরীর দ্বীপের বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, “এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না।”
একই অবস্থা দেশের বিভিন্ন জেলায়। শেরপুরে ৪২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৮-৩২ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ অঞ্চলেও চাহিদার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষিতে সেচ সংকট
লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বোরো ধানের মৌসুমে সেচ দিতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
যশোরের বেনাপোলের কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, “সারাদিন কারেন্ট থাকে না। সেচ দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।”
নাটোরের কৃষক ওয়াজেদ আলীর ভাষ্য, “ধার করে চাষ করেছি। পানি দিতে না পারলে সব শেষ।”
হিমাগারে শঙ্কা
বিদ্যুৎ সংকটে কোল্ড স্টোরেজগুলোও বিপাকে পড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, তাতে বাড়ছে খরচ।
কুমিল্লার এক হিমাগার কর্মকর্তা জানান, “এভাবে চলতে থাকলে আলু ও বীজ নষ্ট হয়ে যাবে।” জয়পুরহাটে মাসে অতিরিক্ত ১৫ লাখ টাকা খরচ বাড়ার কথাও জানিয়েছেন এক ব্যবস্থাপক।
শিল্পাঞ্চলে দ্বিমুখী চাপ
সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—দুই সংকটে পড়েছে। জেনারেটর চালাতে ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কারখানার মালিকরা বলছেন, উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি
গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পোল্ট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। মাছ চাষেও প্রভাব পড়ছে।
ময়মনসিংহের এক খামারি বলেন, “গরমে মুরগি বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ
এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও পড়েছেন বিপাকে। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনার রুটিন ভেঙে যাচ্ছে।
এক পরীক্ষার্থী বলেন, “কখন বিদ্যুৎ থাকবে, তার ঠিক নেই। ঠিকমতো পড়তে পারছি না।”
কতটা ঘাটতি?
বুধবার দেশে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ১২৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আদানি প্ল্যান্টের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে।
আশার কথা, তবে শঙ্কা কাটেনি
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে পুরোপুরি লোডশেডিং শেষ হবে না; তখনও প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “ডিজেলচালিত কেন্দ্র চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তবে সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি।”
পূর্বের পোস্ট :