সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় বান্দরবানের আলীকদম-থানচি সড়কের পাহাড়ি নীরবতা ভেঙে গোপনে চলছে বন উজাড়ের কর্মকাণ্ড। সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে লুকিয়ে তৈরি করা সরু পথ দিয়ে ত্রিপলঢাকা ট্রাকে করে পাচার হচ্ছে কাটা গাছ।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিম পাহাড় এলাকার ২৩ কিলোমিটার পয়েন্টে হঠাৎ দেখা যায় এমনই একটি ট্রাক। ঘন লতায় ঢাকা সরু পথ দিয়ে বেরিয়ে আসে গাড়িটি। ত্রিপলের নিচে ছিল কাটা গাছ। ছবি তুলতে দেখে এক শ্রমিক দৌড়ে পালিয়ে যান, আর ট্রাকটি দ্রুত আলীকদমের দিকে চলে যায়।
পরে ওই পথ ধরে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে খাড়া রাস্তা। প্রায় ১৫ মিনিট নিচে নামার পর চোখে পড়ে স্তূপ করে রাখা বড় বড় গাছ। কোথাও গাছ দ্বিখণ্ডিত, কোথাও চারকোনা করে ‘রদ্দা’ বানানো। আরও নিচে ঝিরির মুখে দেখা যায় বিশাল কাঠের স্তূপ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ‘ব্যাঙঝিরি’ নামে পরিচিত এই ঝিরিটি কয়েকটি পাড়ার খাবার পানির একমাত্র উৎস। কিন্তু গাছের স্তূপ ও ট্রাক চলাচলের কারণে ঝিরির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাড়াবনের বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
পাড়াবন মূলত পাহাড়িদের সামাজিকভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে কিছু নিয়ম রয়েছে। তবে বড় গাছ কাটতে হলে বনবিভাগের অনুমতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ।
শ্রমিকদের অস্থায়ী বসতি
সরেজমিনে ঝিরির নিচে শ্রমিকদের তৈরি দুটি ঝুপড়ি ঘর পাওয়া গেছে। সেখানে গাছ কাটার মেশিন, সোলারচালিত পানির ব্যবস্থা এবং রান্নার সরঞ্জাম রয়েছে। শ্রমিকদের একজন মো. ইসমাইল জানান, সাত-আটজন শ্রমিক দৈনিক ৪০০-৫০০ টাকায় কাজ করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা কাজ করে খাওয়া মানুষ। কাজের আশায় এখানে এসেছি। কয়েক মাস ধরে গাছ কাটা হচ্ছে।”
তবে তার দাবি, বর্তমানে গাছ কাটা বন্ধ হয়েছে এবং এখন শুধু পরিবহন চলছে।
‘লাকড়ি সংগ্রহ’ দাবি ব্যবসায়ীর
অভিযোগের বিষয়ে আলীকদমের ব্যবসায়ী আবু হান ইসমাইল বলেন, তিনি মূলত লাকড়ি সংগ্রহ করেছেন। “জুমের পর পড়ে থাকা গাছ কিনেছি, কাটার জন্য নয়,” দাবি তার।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, গাছ কাটার জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে এবং নতুন করে গাছ ফেলা হয়েছে—যা তার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভিযোগ উপেক্ষা
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের শেষ থেকে এই বন উজাড় চলছে। একাধিকবার বাধা দিয়েও তা বন্ধ করা যায়নি। এমনকি প্রশাসন ও সেনা জোনে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বলেন, “অভিযানের ভয়ে রাতেও গাছ সরানো হয়েছে। শ্রমিকরা জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে।”
পানি সংকট ও জীববৈচিত্র্যের হুমকি
গাছ কাটার ফলে ঝিরির পানির প্রবাহ কমে গেছে। আগে যেখানে সারাবছর পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যপ্রাণী।
স্থানীয়রা জানান, একসময় এখানে বন্য শুকর, হরিণ, বানর এমনকি ভালুকও দেখা যেত। বন উজাড়ে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
প্রশাসনের অভিযান প্রতিশ্রুতি
লামা বনবিভাগের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, এলাকা দুর্গম হওয়ায় নজরদারিতে সমস্যা রয়েছে। তবে ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনজুর আলম বলেন, “বনবিভাগ ও পুলিশ নিয়ে দ্রুত অভিযান চালানো হবে। না হলে এ কার্যক্রম আরও বাড়বে।”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তফিজুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পূর্বের পোস্ট :