নতুন বাংলা বছরের প্রথম সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’তে থাকছে পাঁচটি ভিন্ন মোটিফ। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক উত্তরণসহ নানা বার্তা তুলে ধরতেই এসব প্রতীক বেছে নেওয়া হয়েছে।
এবারের শোভাযাত্রায় থাকছে—মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, মোরগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময় এক ধরনের শাসনব্যবস্থার মধ্যে থাকার পর একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে। নতুন ভোরের প্রতীক হিসেবেই মোরগকে নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, এ দেশে ন্যায়বিচার ফিরে আসুক।”
এবার নববর্ষ উদ্যাপনের প্রতিপাদ্য—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
দোতারা দিয়ে প্রতিবাদ, পায়রায় শান্তির বার্তা
শোভাযাত্রায় দোতারার মোটিফ যুক্ত করার বিষয়ে ডিন বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল শিল্পীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতেই এ প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে লোকসংগীতের ঐতিহ্য রক্ষার বার্তাও এতে রয়েছে।
কারুশিল্প বিভাগের শিক্ষক রাকিন নাওয়ার বলেন, পায়রা শান্তির প্রতীক হিসেবে থাকছে। আর হাতির মোটিফটি নেওয়া হয়েছে নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতির আদলে। কিশোরগঞ্জের টেপা ঘোড়াও দেশীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে শোভাযাত্রায় যুক্ত হয়েছে।
আলপনা ও পটচিত্রে ঐতিহ্যের ছাপ
চারুকলার দেয়ালে আঁকা হয়েছে নকশি কাঁথার আলপনা। ভেতরে টানানো হয়েছে পাঁচটি পটচিত্র।
এসব পটচিত্রে উঠে এসেছে সুন্দরবনের বনবিবি, মুঘল সম্রাট সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গাজীর পট ও মনসামঙ্গলের বেহুলার কাহিনি।
পটশিল্পী টাইগার নাজির বলেন, “আমরা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চেয়েছি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ের দেশপ্রেমিকদের চিত্রও এতে আছে।”
থাকছে জীবন্ত ঘোড়া
গতবারের মতো এবারও শোভাযাত্রায় থাকবে জীবন্ত ঘোড়া। তবে পরিকল্পনা থাকলেও হাতি রাখা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, পুলিশের সহায়তায় ঘোড়ার বহর শোভাযাত্রায় অংশ নেবে।
চার দিনের আয়োজন
চৈত্রসংক্রান্তি থেকে শুরু হয়ে চার দিনব্যাপী আয়োজন করেছে চারুকলা অনুষদ।
শেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন বছরের সকালে শোভাযাত্রা এবং পরবর্তী দুই দিন যাত্রাপালা ও পালাগানের আয়োজন থাকবে। শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় চারুকলা থেকে শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি ঘুরে আবার চারুকলায় এসে শেষ হবে।
নিরাপত্তা জোরদার
নববর্ষ উদ্যাপন ঘিরে ক্যাম্পাসে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মুখোশ পরে বা ব্যাগ নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকছে, তবে চারুকলার তৈরি মুখোশ বহন করা যাবে। পহেলা বৈশাখে মোটরসাইকেল চলাচলও নিষিদ্ধ থাকবে।
ডিন বলেন, “পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো শঙ্কা নেই।”
নাম পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ
শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। আগে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, পরে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ এবং এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’—এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
শিক্ষার্থী মৃধা রাইয়ান বলেন, “প্রতিবার নাম পরিবর্তন হলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এর ব্যাখ্যা থাকা দরকার।”
তবে ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত। “আমরা নামের চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।”
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
আশির দশকে সামরিক শাসনের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায় এবং ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে।
বিভিন্ন বিতর্ক ও পরিবর্তনের মধ্যেও চারুকলার এ আয়োজন নববর্ষ উদ্যাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবেই থাকছে।
পূর্বের পোস্ট :