জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ জয়ের ধারা বজায় রেখেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রথমবার আয়োজিত এই নির্বাচনে ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্পাদকীয় পদে জয় পেয়েছে শিবির সমর্থিত প্যানেল।

এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নেতৃত্বই গেল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের হাতে।

ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসুর পর এবার জকসুতেও জয়ী হয়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখল সংগঠনটি।

এক বছরের মেয়াদের জকসুতে ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস ও এজিএসের পাশাপাশি সম্পাদকীয় আটটি পদে জয় পেয়েছে শিবির নেতৃত্বাধীন ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের সমর্থিত প্যানেল জয় পেয়েছে তিনটি সম্পাদক পদে।

নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম। তিনি আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ৫ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে তিনি ৮৭০ ভোটের ব্যবধানে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থী একেএম রাকিবকে পরাজিত করেন। রাকিব পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট।

সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হয়েছেন শিবির শাখার সেক্রেটারি আব্দুল আলিম আরিফ। আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ২২৩ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ২৫২।

সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে শিবিরের মাসুদ রানা ৫ হাজার ২০ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আতিকুর রহমান তানজিল পেয়েছেন ৪ হাজার ২২ ভোট। ব্যবধান ছিল ৯৯৮ ভোট।

জকসুর শীর্ষ তিনটি পদেই শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থীরা। ভিপি ও এজিএস পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও শেষ পর্যন্ত জয় শিবিরের পক্ষেই যায়।

সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের জয়

চব্বিশের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসান হলে দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন শুরু হয়। ধারাবাহিকভাবে সব নির্বাচনে চমক দেখিয়ে জয় পায় ছাত্রশিবির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায় শিবির সমর্থিত প্যানেল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে (জাকসু) ভিপি পদে হারলেও ২৫টির মধ্যে ২০টি পদে জয় পায় সংগঠনটি। প্রায় তিন যুগ পর চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও নিরঙ্কুশ জয় পায় শিবির সমর্থিত প্যানেল। চাকসুতে ২৬টির মধ্যে ২৪টি এবং রাকসুতে ২৩টির মধ্যে ২০টি পদে জয় পায় তারা।

ভোট ও ফল ঘোষণা

দুই দফা পেছানোর পর মঙ্গলবার জকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। গণনায় প্রাথমিক বিপত্তি কাটিয়ে পরদিন বুধবার মধ্যরাত পেরিয়ে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা হাসান।

ভোটগ্রহণ শেষে সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ব্যালট বাক্স এনে ছয়টি ওএমআর মেশিনে ভোট গণনা শুরু হয়। তথ্যগত গড়মিলের কারণে দীর্ঘ সময় গণনা বন্ধ থাকলেও গভীর রাতে আবার শুরু হয়। প্রথম চার বিভাগের ফল প্রকাশ করতে করতে সকাল হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯টি কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। এবার মোট ভোটার ছিলেন প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, কেন্দ্রীয় সংসদে প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং হল সংসদে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পড়ে।

প্রথম জকসু নির্বাচন

২০০৫ সালে কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পর এই প্রথম জকসু নির্বাচন হলো। ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’-এ ছাত্র সংসদের বিধান না থাকায় এতদিন নির্বাচন হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ২৮ অক্টোবর জকসু নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ৫ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ২২ ডিসেম্বর ভোটের দিন নির্ধারণ হলেও ভূমিকম্পে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় তা ৩০ ডিসেম্বর করা হয়। ওই দিন ভোরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত হয়। পরে নতুন তারিখে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দুই দশক পর প্রথম ভোটে অংশ নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।