বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে তার দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একইসঙ্গে, বিএনপি এটি করতে চায় না বলে বিরোধীরা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘এমাজউদ্দীন আহমদ রিসার্চ সেন্টার’ আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনে জনগণের সামনে উপস্থাপিত ইশতেহারের ভিত্তিতে বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
তিনি বলেন, জনগণ সেই ইশতেহারের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের ভোট দিয়েছে। বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এই বিষয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধীদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাবে বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন যে, জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যৌথভাবে অংশগ্রহণকারী সকল দল একসঙ্গে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিল এবং বিএনপি এর প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, আমরা বারবার বলেছি যে আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়ন করব। এটি আমাদের অঙ্গীকার।
তবে ফখরুল জানান, প্রস্তাবিত সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির মতো কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপি কখনোই একমত হয়নি।
তিনি বলেন, সংস্কার কমিশন বিএনপির সম্মতি ছাড়াই বেশ কিছু সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ জুলাই সনদেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত দলগুলো তাদের নিজ নিজ নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করবে।
বিএনপির এ নেতা বলেন, আমরা যেভাবে আমাদের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, ঠিক একইভাবে জুলাই সনদের প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা যেভাবে অঙ্গীকার করেছি, সেভাবেই এই সনদ বাস্তবায়ন করব। আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে চাই না—এমন কথা বলা সম্পূর্ণ ভুল।
বিএনপি সংস্কারের বিরোধী—এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, বিএনপি নিজেই বাংলাদেশে প্রধান প্রধান গণতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা করেছিল।
ফখরুল বলেন, এই দেশে সংস্কারের প্রবর্তন কে করেছিল? বিএনপি করেছিল। একদলীয় শাসনের পর বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করে। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির পর বিএনপি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করে। বিএনপিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান পাস করেছিল।
তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, তারা জুলাইকে কেবল ক্ষমতায় আসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। আমরা চাই না জুলাই রাজনৈতিক ক্ষমতার আরেকটি হাতিয়ারে পরিণত হোক।
বিএনপি মহাসচিবের মতে, জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৮-১৯ বছরের লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ ছিল।
তিনি দাবি করেন, এই আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতা-কর্মী মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে প্রায় ১,৭০০ নেতা-কর্মী গুম হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ফখরুল বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান বছরের পর বছর ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের পর একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে দেশ পুনর্গঠন যে সহজ হবে না, তা তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো জটিল। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা রাতারাতি দূর হতে পারে না। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু ঠিক করতে পারব না, তবে আমাদের ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপি নেতা তাকে একজন খাঁটি গণতন্ত্রকামী, উদার গণতন্ত্রের প্রবক্তা, অসামান্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং এক মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি স্মরণ করেন যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় এমাজউদ্দীনের বাসভবনে প্রায়ই বৈঠক হতো, যেখানে বুদ্ধিজীবীদের একত্রিত করে গণতন্ত্রের পক্ষে বিবৃতি তৈরি ও কৌশল নির্ধারণ করা হতো।
পূর্বের পোস্ট :