দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ আরও কমেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে ৬৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। আগের দিন সোমবার রাতে সরবরাহ ছিল ৬৬ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এক দিনের ব্যবধানে সরবরাহ কমেছে ৩ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
এদিকে এলএনজি টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ২০ ও ২৩ আগস্ট দুটি এলএনজিবাহী কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। কার্গো দুটি থেকে এলএনজি খালাস হলে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন বিবরণী অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ১৬২ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। আগের দিন উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৬১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২২৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। সোমবার রাতে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ২২৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। ফলে এক দিনের ব্যবধানে মোট সরবরাহ কমেছে ২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সেই হিসাবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চাহিদার মাত্র ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ঘাটতি ছিল প্রায় ১৫৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট।
সক্ষমতার অর্ধেকের কিছু বেশি সরবরাহ
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। মঙ্গলবার এলএনজি সরবরাহ হয়েছে এর ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার ১৭ থেকে ১৮ আগস্টের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৬৩ কোটি ৮৩ লাখ ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৬২ কোটি ৪৬ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সরবরাহ ছিল ২২৬ কোটি ২৮ লাখ ঘনফুট।
এর আগের ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ ১৫ থেকে ১৬ আগস্ট, এলএনজি সরবরাহ ছিল ৮০ কোটি ৩৮ লাখ ঘনফুট। সেই হিসাবে এক দিনের ব্যবধানে এলএনজি সরবরাহ কমেছে ১৭ কোটি ৯২ লাখ ঘনফুট বা ২২ দশমিক ৩ শতাংশ।
এক্সিলারেটের মজুত কমেছে
দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানির। দুটি টার্মিনালই পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি।
টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার একটি টার্মিনাল থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি এবং অন্যটি থেকে প্রায় ৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এক্সিলারেটের টার্মিনালে এলএনজির মজুত কমে যাওয়ায় সেখান থেকে সরবরাহ কমেছে। তবে সামিটের টার্মিনাল স্বাভাবিকভাবে চলছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন কার্গো থেকে এলএনজি খালাস শুরু হলে সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হবে। একটি কার্গো ২০ আগস্ট এবং আরেকটি ২৩ আগস্ট আসার কথা রয়েছে। প্রথম কার্গো আসার আগ পর্যন্ত গ্যাসের বড় ধরনের ঘাটতি হবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে গত ২১ জুলাই আগুনে এক্সিলারেটের টার্মিনালের বৈদ্যুতিক কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। এর মধ্যে ১৩ আগস্ট সামিটের টার্মিনালও বন্ধ হয়ে যায়। এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পরদিন সামিটের টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ শুরু হয়। একই দিনে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হলেও রাতে সেখান থেকেও পুনরায় সরবরাহ শুরু হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বড় ঘাটতি
পেট্রোবাংলার ১৭ থেকে ১৮ আগস্টের প্রতিবেদনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাসের দৈনিক চাহিদা দেখানো হয়েছে ২৫২ কোটি ৪৯ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৪ কোটি ৫১ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চাহিদার মাত্র ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ গ্যাস পেয়েছে। ঘাটতি ছিল ১৫৭ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ১৭ আগস্টের প্রতিবেদনে ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিটে সরাসরি গ্যাস–সংকটের কথা বলা হয়েছে। আরও দুটি কেন্দ্রে গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সমস্যার তথ্য রয়েছে।
গ্যাস–সংক্রান্ত সমস্যায় থাকা ২৫টি কেন্দ্র বা ইউনিটের মধ্যে ১৩টি থেকে সোমবার সারা দিনে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। এসব কেন্দ্রের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৩৮০ দশমিক ২২ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। বর্তমান বাস্তব সক্ষমতা ২৮ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সোমবার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৮৯১ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট, যা স্থাপিত সক্ষমতার ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের এই ব্যবধান শুধু গ্যাস–সংকটের কারণে নয়। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ, যান্ত্রিক ত্রুটি ও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণেও উৎপাদনের বাইরে ছিল। এ ছাড়া ২৮টি কেন্দ্র বা ইউনিটে তরল জ্বালানির সংকট এবং দুটি কেন্দ্র বা ইউনিটে কয়লার সংকটের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্বের পোস্ট :