শোলে’, ‘গয়াল’, ‘আয়ে মিলন কি বেলা’, ‘ড্রিম গার্ল’ কিংবা ‘ধর্ম বীর’—হিন্দি সিনেমায় একের পর এক কালজয়ী চরিত্রে অভিনয় করে যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন, সেই বলিউড সুপারস্টার ধর্মেন্দ্র দেওল আর নেই। ৯০তম জন্মদিনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে চিরবিদায় নিলেন তিনি।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়নি। কিন্তু বলিউডের পরিচালক–প্রযোজক করণ জোহর সোশাল মিডিয়ায় লিখে শোক জানিয়েছেন—

‘একটি যুগের অবসান… তিনি ছিলেন ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি। মানুষ হিসেবেও ছিলেন সেরা। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সবার প্রিয় ছিলেন তিনি।’

হাসপাতাল, গুজব, তারপর আকস্মিক শেষযাত্রা

অক্টোবরের শেষ দিকে ফুসফুসের জটিলতায় মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হন ‘হি–ম্যান’ খ্যাত ধর্মেন্দ্র। তখনই তার মৃত্যুশঙ্কা নিয়ে ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ে। মেয়ে এশা দেওল সেসময় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তার বাবা স্থিতিশীল আছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন।

পরবর্তীতে বাড়ি ফেরেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। তাকে দেখতে যান সহশিল্পী অমিতাভ বচ্চনও। ভারতীয় গণমাধ্যমে কয়েকদিন আগেও খবর এসেছিল—ধর্মেন্দ্র বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগোচ্ছেন।

তার মধ্যেই সোমবার সকালে মুম্বাইয়ের জুহুতে অভিনেতার বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। একটি অ্যাম্বুলেন্স বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার স্ত্রী হেমা মালিনী ও মেয়ে এশা দেওলকে পরে দেখা যায় পবনহংস শ্মশানে। সেখানে পৌঁছান অমিতাভ বচ্চন, সেলিম খান, আমির খান, সালমান খান, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় কুমার, অভিষেক বচ্চনসহ বলিউডের বহু তারকা।

বলিউড শোকস্তব্ধ

ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুতে পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শর্মিলা ঠাকুর, সায়রা বানু, করণ জোহর, কারিনা কাপুর খান, বোমান ইরানি থেকে অনন্যা পান্ডে—সকলেই শোক প্রকাশ করেছেন।

গ্রামের ছেলে থেকে বলিউড–তারকা

ধর্মেন্দ্রর জন্ম ১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর, পাঞ্জাবের নাসরালি গ্রামে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলেটি ছোটবেলাতেই টের পেয়েছিলেন সিনেমার প্রতি নিজের গভীর টান।

ফিল্মফেয়ার ট্যালেন্ট প্রতিযোগিতায় জিতে ১৯৬০ সালে বলিউডে প্রবেশ। ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’—এই সিনেমা দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ।

এর পরের ছয় দশকে তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে গড়ে তোলেন স্বর্ণোজ্জ্বল ক্যারিয়ার।

রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন হিরো

ষাটের দশকের মাঝামাঝি ‘ফুল অউর পাথর’, ‘অনুপমা’, ‘আয়ে দিন বাহার কে’–তে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। পরে ‘ধর্ম বীর’, ‘হুকুমত’, ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ‘দোস্ত’, ‘বন্দিনী’, ‘সত্যকাম’—একটি–দুটি নয়, অসংখ্য সিনেমায় দাপট দেখান তিনি।

হৃষিকেশ মুখার্জির ‘চুপকে চুপকে’ ধর্মেন্দ্রকে বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী কমেডি–অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।

‘শোলে’—যে সিনেমা ইতিহাস বদলে দেয়

১৯৭৫ সালের ‘শোলে’ ধর্মেন্দ্রর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। জয়–বীরুর বন্ধুত্ব, গব্বরের দাপট—সিনেমাটি বলিউডের ইতিহাসে অনন্য। জয় চরিত্রে অমিতাভ আর বীরু চরিত্রে ধর্মেন্দ্র ভারতীয় দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন।

পুরস্কার ও শেষ কাজ

২০১২ সালে তাকে দেওয়া হয় ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’।

ধর্মেন্দ্রকে শেষবার দেখা যায় ‘তেরি বাতো মে অ্যায়সা উলঝা জিয়া’ সিনেমায়।

তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘ইক্কিস’ মুক্তি পেতে যাচ্ছে আগামী ২৫ ডিসেম্বর।

ব্যক্তিজীবন—হেমা মালিনী ও দুই সংসার

ধর্মেন্দ্র–হেমা মালিনীর প্রেম শুরু হয় ‘তুম হাসিন ম্যায় জাওয়ান’-এর শুটিংয়ে। তখন ধর্মেন্দ্র ছিলেন বিবাহিত ও চার সন্তানের বাবা। প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর তালাক না দেওয়ায় ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তারা। ‘দিলওয়ার খান কেওয়াল কৃষ্ণ’ নামে পরিচিত হন ধর্মেন্দ্র। এই দম্পতির দুই মেয়ে—এশা দেওল ও অহনা দেওল।

অন্যদিকে প্রথম সংসারে ধর্মেন্দ্রর চার সন্তান—সানি দেওল, ববি দেওল, অজিতা দেওল ও বিজিতা দেওল।

হেমা মালিনীর সঙ্গে তিনি ৩০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন—‘সীতা অউর গীতা’, ‘ড্রিমগার্ল’, ‘জুগনু’, ‘শরিফ বদমাশ’সহ বহু সিনেমা আজও জনপ্রিয়।