কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল থেকে অবৈধ নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসছে বহুস্তরবিশিষ্ট মানবপাচার চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই চক্র রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয় বাংলাদেশিকে পাচারচক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের বয়ানে ইঙ্গিত মিলেছে, অন্তত দুজন হয়তো প্রতারণার শিকার।
চক্রের বিস্তৃতি উপকূলজুড়ে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই যাত্রা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দালালদের মাধ্যমে যাত্রী সংগ্রহ করে ট্রলারে তোলা হয়।
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, ‘মাহ নূর’ নামে এক দালাল তাকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ট্রলারে তোলে। পরে পরিবার থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়। ট্রলারডুবির পর ওই দালাল গা-ঢাকা দেয়।
স্থানীয় পর্যায়েও দালাল চক্র সক্রিয়। রামুর কচ্ছপিয়া এলাকা থেকে একসঙ্গে চার যুবকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন দালাল এ কাজে জড়িত।
‘মাঝি’ নাকি চক্রের অংশ
বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের কেউ ট্রলার চালনা, কেউ ইঞ্জিন পরিচালনা, আবার কেউ যাত্রীদের ওপর নির্যাতনের দায়িত্বে ছিল। এতে বোঝা যায়, ট্রলারে থাকা ব্যক্তিরা একই চক্রের অংশ।
তবে অভিযুক্তদের পরিবারের দাবি, তারা শ্রমিক বা সাধারণ যাত্রী। স্থানীয়দের মতে, পূর্বে একই পথে যাতায়াত করা ব্যক্তিদেরই পরবর্তীতে ‘রিক্রুটার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভয়াবহ যাত্রা: ‘মৃত্যুকূপ’ ট্রলার
রফিকুল ইসলামের বর্ণনায়, প্রায় ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি যাত্রা করে। আন্দামান সাগরে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের জোর করে সংকীর্ণ কুঠুরিতে ঢুকিয়ে রাখা হয়।
“শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল না… ২৫-৩০ জন সেখানেই মারা যায়,” বলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত উত্তাল ঢেউয়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। একটি পানির বোতল ধরে ভেসে থেকে তিনি প্রাণে বাঁচেন।
২৫০ জন নিখোঁজ, নেই তালিকা
এই ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন এখনো নিখোঁজ বলে ধারণা করা হলেও প্রশাসনের কাছে তাদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই। ভুক্তভোগী পরিবার থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি।
জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।
তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ
টেকনাফ থানার ওসি জানান, কোস্ট গার্ডের করা মামলায় ছয়জনকে আসামি করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
‘স্বেচ্ছা পাচার’: হতাশার সুযোগ
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান এই প্রবণতাকে ‘স্বেচ্ছায় ট্রাফিকিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রহীনতা ও অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে, আর সেই সুযোগ নিচ্ছে পাচারচক্র।
এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হলো—মানবপাচার শুধু অপরাধ নয়, এটি দারিদ্র্য, হতাশা ও প্রতারণার জটিল এক চক্র, যার শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
পূর্বের পোস্ট :