পাঁচ বছর বয়সী সাফিনা বাবার কাঁধে চড়ে চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখছে। বাঘের খাঁচার সামনে যেতেই ‘টাইগার’ বলে চিৎকার দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ তার। বইয়ের পাতায় দেখা বাঘকে সামনে পেয়ে বিস্ময়ে ভরে ওঠে তার চোখেমুখ।
সাফিনার বাবা সোহেল মেয়েকে দেখিয়ে বলেন, “হ্যাঁ মা, এটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার।” এরপর বাঘ কী খায়, কেন খাঁচায় রাখা—এমন নানা প্রশ্নে বাবাকে ব্যস্ত রাখে ছোট্ট সাফিনা।
নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে মেয়েকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন সোহেল। তিনি জানান, অনেকদিন ধরেই মেয়ের বায়না ছিল এখানে আসার। ঈদের দিন নামাজ শেষে সকালেই বেরিয়ে পড়েন তারা। “বইয়ে দেখা পশুপাখিগুলো সামনে দেখে সে অনেক খুশি,” বলেন তিনি।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে চিড়িয়াখানায় আসা হাজারো শিশু-কিশোরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবে খাঁচার সামনে ভিড় থাকলেও ঘুমিয়ে থাকা বাঘ দেখে কিছুটা হতাশ হয় চার বছর বয়সী সিয়াম। বারবার ডাকাডাকিতেও বাঘের কোনো সাড়া না পেয়ে পরে অন্য খাঁচায় গিয়ে জোড়া বাঘ দেখে খুশি হয় সে।
কল্যাণপুরের বাসিন্দা মিজানুর রহমান পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে বলেন, “ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি, তাই বাচ্চাদের নিয়ে বের হয়েছি। তারা খুশি, আমরাও খুশি।”
ঈদের দিন সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা। কোথাও গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানামুখী সড়কে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়, যা একসময় জনস্রোতে রূপ নেয়।
চিড়িয়াখানায় আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে যেমন মিরপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষ ছিলেন, তেমনি দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন। শিশুদের আনন্দকে কেন্দ্র করে এই ঈদ বিনোদনে বড়রাও সামিল হয়েছেন।
চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম হলেও এদিন প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থী এসেছেন।
উত্তরা থেকে আসা স্কুলশিক্ষার্থী রাইসা ও রাইয়ানও পরিবারসহ ঘুরতে এসে আনন্দ প্রকাশ করে। “অনেক নতুন পশুপাখি দেখলাম,” বলে তারা।
চিড়িয়াখানার বিভিন্ন খাঁচার সামনে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। বাঘ, সিংহ, হাতি, হরিণ, বানর, জিরাফ, জেব্রার পাশাপাশি অপরিচিত প্রাণীও আগ্রহ নিয়ে দেখেছে শিশুরা। বর্তমানে এখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৩৫০০ প্রাণী রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
খাঁচার ভেতর পাখিদের ওড়াউড়ি, ময়ূরের পেখম মেলা কিংবা সাপ-সরীসৃপ দেখে শিশুদের মাঝে যেমন আনন্দ, তেমনি ভয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।
কিছু দর্শনার্থী হরিণকে লতাপাতা খাওয়ানো কিংবা বানরের দিকে খাবার ছুড়ে দেওয়ার মতো নিষিদ্ধ কাজও করেছেন। আবার কেউ কেউ জেব্রা বা ঘোড়ার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন।
এদিন জলহস্তীকে কাছ থেকে খাবার খেতে দেখে মুগ্ধ হয় অনেক শিশু। ভাষানটেক থেকে আসা শুভ জানায়, জীবনে প্রথমবার এত কাছ থেকে এমন প্রাণী দেখছে সে।
বানরের খাঁচার সামনে ছিল বাড়তি ভিড়। কুলু বানরের বাচ্চার দুষ্টুমি দেখে হাসিতে ফেটে পড়ে ছয় বছর বয়সী অবন্তি। বাবার সঙ্গে ঘুরতে এসে সে জানায়, “আজ অনেক পশুপাখি দেখেছি, সারাদিন আরও দেখব।”
ঈদ উপলক্ষে বাড়তি দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, পুলিশ ও নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীদের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও জোরদার করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদে ঘুরে দেখতে পারেন।
পূর্বের পোস্ট :