বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের মধ্যেও এয়ারবাস বিক্রির আশা ছাড়েনি ফ্রান্স। ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেছেন, এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এক সময় যে ‘ভালো মনোভাব’ দেখিয়েছিল, নতুন সরকার সেখান থেকেই আলোচনা এগিয়ে নেবে বলে তারা আশা করছেন।

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।

এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ না কিনলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি বলতে পারি, এয়ারবাস নিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে এখনও আলোচনা করছি। এয়ারবাস সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। শেষে কী ঘটে আমরা তা দেখব, আমি এখন জানি না।

“আলোচনায় কী আসবে, তার উপর এটি নির্ভর করছে। আমরা এখন আলোচনা করছি এবং আমরা আশা করি, এয়ারবাসকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক আলোচনা করেছি—কারিগরি আলোচনা হয়েছে এবং এয়ারবাসের প্রস্তাব বিমান (বাংলাদেশ) খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছিল। সুতরাং আলোচনা এখনও চলছে এবং আমরা বিমানের উপর নির্ভর করছি।”

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে উড়োজাহাজ বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে আসছে ফ্রান্সভিত্তিক ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস।

এর মধ্যে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ বলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ ‘কেনার প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।

এয়ারবাস থেকে আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি যখন ‘পর্যালোচনার’ মধ্যে ছিল, তখনই মার্কিন কোম্পানি বোয়িংও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে দুই পক্ষের দেনদরবারের মধ্যেই ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেন, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৫ শতাংশ শুল্কের ঝুঁকি এড়াতে গত জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়।

এর ফলে এয়ারবাস থেকে বিমানের জন্য ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার আগের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর ইউরোপও বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এয়ারবাস বিক্রির জন্য সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে।

গত বছর জুন মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এয়ারবাসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভাউটার ভ্যান ভার্স। এরপর থেকে কোম্পানিটির প্রতিনিধিরা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।

গত নভেম্বরের শুরুতে ঢাকায় ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করা হবে।

তারা ইউরোপে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর বাংলাদেশি পণ্যের বাজার, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘ অংশীদারত্বের বিষয়গুলোও স্মরণ করিয়ে দেন।

এর মধ্যে ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটৎস এক অনুষ্ঠানে সরাসরি বলেন, এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার ‘প্রতিশ্রুতি’ থেকে বাংলাদেশ সরে এলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে ‘প্রভাব পড়তে পারে’।

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপের বাজারে শুল্কছাড়ের আলোচনার পরিবেশও এয়ারবাস নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের কারণে বদলে যেতে পারে।

এয়ারবাস থেকে যাত্রী ও পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেনা থেকে সরে এলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের শেষ সময়ে ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এগিয়ে নেয়।

ওই যুদ্ধবিমান কেনার লক্ষ্যে গত ৯ ডিসেম্বর ইতালীয় কোম্পানি লিওনার্দো এসপিএর সঙ্গে আগ্রহপত্রে সই করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।

লিওনার্দো এসপিএ, বিএই সিস্টেমস এবং এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস কোম্পানির কনসোর্টিয়াম ইউরোফাইটার জিএমবিএইচের অধীনে ইউরোফাইটার টাইফুন তৈরি ও বাজারজাত করা হয়।

নতুন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়টি ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, “এয়ারবাস অবশ্যই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা এয়ারবাস খুব ভালো মানের উড়োজাহাজ তৈরি করছে। বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোর বহরে বোয়িং এবং এয়ারবাস—দুটোই রয়েছে। আর উড়োজাহাজের সোর্সিংয়ের বহুমুখীকরণ গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি বলেন, “সুতরাং এয়ারবাস এমন একটি কোম্পানি, যাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার কাজ আমি এয়ারবাসের ওপরই ছেড়ে দেব। প্রথম এই বৈঠকে আমি আরও দীর্ঘমেয়াদি ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে এসেছি।”

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “আমরা আশা করি, সরকার এবং বিমান এয়ারবাসকে বিবেচনায় নেবে। তবে অবশ্যই এটি আজকের আলোচনার প্রধান বিষয় নয়।”

নতুন সরকারের তরফে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের আশা ফ্রান্স করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি সরকারের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি। এটি নতুন সরকার, তাদের সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে।

“আমরা নিশ্চিত, সরকার বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেবে। এসব আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি আগ বাড়িয়ে কিছু বলব না।”

এদিকে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের এমন বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, “আমাদের দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সব বন্ধু দেশের সঙ্গেই ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট ও ফরেন পলিসি নিয়ে আলোচনা হয়।

“আমি বারবারই বলেছি, আবারও বলছি—সব দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে।”