শেষ হলো অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। রোববার (সমাপনী দিনে) রাত ৯টায় বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৮ দিনের এই আয়োজনের পর্দা নামে।

সমাপনী দিনের সন্ধ্যায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারার স্টলে দেখা যায় কর্মীরা বই গুছিয়ে কার্টুনে ভরছেন। গত ১৮ দিন ধরে বইপ্রেমীদের ভিড়ে জমজমাট থাকা স্টলগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে।

মুক্তধারার বিপণন কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সেন চৌধুরী বলেন, “দেখতে দেখতে তো মেলা শেষ হয়ে গেল। এবার মেলা ১৮ দিনের হওয়ায় লোকজন তুলনামূলক কম এসেছে। তবে যারা এসেছেন, তারা আনন্দ নিয়ে মেলায় ঘুরেছেন এবং স্বস্তিতে পছন্দের বই কিনেছেন।”

মুক্তধারার হাত ধরেই ১৯৭২ সালে এই বইমেলার সূচনা হয়েছিল। চলতি বছরের মেলা শুরু হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিনের মতো সমাপনী দিনেও মেলা শুরু হয় দুপুর ২টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। ইফতারের পর অনেক দর্শনার্থী মেলায় আসেন।

আবৃত্তিশিল্পী জহির রায়হান বলেন, “এবার মেলায় আসা হয়নি। সমাপনী দিনের শেষবেলায় এসে একটু ঘুরলাম।”

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন স্টলে শেষ মুহূর্তেও বইপ্রেমীদের ভিড় দেখা যায়। বাতিঘর স্টলের সামনে অনেকেই বই কিনতে ভিড় করেন।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থেকে আসা কবি কাজী বর্ণাঢ্য বলেন, “এবার দুই দিন মেলায় এসেছি। বইমেলা তো আমাদের কত আনন্দ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছে।”

এবারের মেলায় অন্যতম আকর্ষণ ছিল কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার। রাত সাড়ে ৮টায় তাদের শেষ পুতুলনাট্যের প্রদর্শনীতে নানা বয়সী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

সমাপনী দিনে মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়ে ২৩৬টি। সব মিলিয়ে এবারের মেলায় নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৭টি।

বিকাল সাড়ে ৩টায় আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। তিনি বলেন, “সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদযাপন আগামী দিনের বইমেলার জন্য নতুন প্রত্যাশা জাগাবে।”

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “আমরা এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মাঝেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায়ের বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলে, সেটিই মানসম্পন্ন বই।”

সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেলায় বাংলা একাডেমিসহ সব প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে।

তথ্যমতে, বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯ টাকার বই বিক্রি করেছে। মেলায় মোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, যার মধ্যে ১৪টি মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।

২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের মোট বিক্রি প্রায় ৮ কোটি টাকা। গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

গত বছর মাসব্যাপী বইমেলায় অংশ নেওয়া অর্ধেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রির তথ্য অনুযায়ী ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি মিলিয়ে মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছিল মেলা কমিটি। ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার এবং ২০২৩ সালে ৪৭ কোটি টাকার বই।

এবার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৬৮ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। শিশুদের জন্য ৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১১১ ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ৯০টি লিটল ম্যাগাজিনকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়।