বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে ৬০ হাজার গাড়িচালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

৫ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাব্বীর হাসান খান এবং বিআরটিসির পক্ষে স্বাক্ষর করেন চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আব্দুল লতিফ মোল্লা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট—বাংলাদেশ পুলিশ, ডিজিএইচএস ও বিআরটিএ—এর কর্মকর্তারা এবং বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ভয়াবহ বাস্তবতায় সড়ক নিরাপত্তা উদ্যোগ

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসেবে, ২০২১ সালে দেশে প্রায় ৩২ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১ শতাংশ। এই ব্যবধান সড়ক নিরাপত্তায় কার্যকর ও কাঠামোগত উদ্যোগের জরুরি প্রয়োজনকে স্পষ্ট করে।

গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সময়কালে দেশে ৫০ হাজার ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৯ হাজার ৫১৪ জন, আহত হয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ১২৫ জন। এই বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি দেশের উন্নয়ন যাত্রার জন্য বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প

এই বাস্তবতায় সড়ক নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প’ গ্রহণ করে। প্রকল্পটি ১৮ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো—

  • সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানো

  • সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি

এই লক্ষ্য অর্জনে প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ পাইলট ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই পদ্ধতির পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো—দক্ষ চালকের মাধ্যমে নিরাপদ যানবাহন পরিচালনা।

৬০ হাজার চালক প্রশিক্ষণ

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রকল্পের আওতায়—

  • ৪০ হাজার নতুন চালককে চার মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ চালক হিসেবে গড়ে তোলা হবে

  • ২০ হাজার পেশাদার চালককে সড়ক নিরাপত্তা, পথচারীর অধিকার ও উন্নত যানচালনা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে

অর্থাৎ, মোট ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে।

এ সংক্রান্ত প্যাকেজটি ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। অনুমোদিত প্যাকেজের আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)।

সারা দেশে বিআরটিসির বিদ্যমান ২৭টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও সেন্টারে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

নিরাপদ সড়ক ও কর্মসংস্থানের পথে

এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কেবল সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হবে না, বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল চালকই নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

দ্রুত নগরায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই উদ্যোগ একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বিত হবে।