‘ভোটের সঙ্গে গণভোট হবে শুনছি। কিন্তু কীভাবে হবে, কী ভোট দেব, কিছুই জানি না।’—ঢাকার মহাখালী এলাকার চা দোকানি শান্ত আহমেদ রতনের এই বক্তব্যই প্রতিফলন ঘটায় আসন্ন গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তির।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই জাতীয় সনদের অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে জনগণের মতামত নিতে গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। তবে ভোটের তারিখ সামনে এলেও গণভোটের প্রশ্ন, পদ্ধতি ও ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালালেও তা মূলত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ খুলে যাবে।
কিন্তু জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, সরকার কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে না। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, অতীতের গণভোটে সরকার একতরফাভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে—এ দাবি সঠিক নয়।
চার প্রশ্নে এক ভোট
স্বাধীনতার পর চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গণভোটে জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি একটি আলাদা ব্যালটে চারটি প্রস্তাবের ওপর একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ।
বিভ্রান্তি সর্বস্তরে
গণভোটের প্রশ্ন সম্পর্কে অনিশ্চয়তা শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেই নয়, শিক্ষিত ও পেশাজীবীদের মধ্যেও রয়েছে। গাড়িচালক, চা দোকানি, নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বেসরকারি চাকরিজীবীরাও জানিয়েছেন—ভোট দিলে কী হবে, না দিলে কী হবে, তা তারা জানেন না।
সরকারি প্রচার ও সমালোচনা
সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বার্তা, এনজিও, ব্যাংক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনও ব্যানার ও লিফলেটের মাধ্যমে গণভোটের তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে বিএনপি ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টসহ কয়েকটি দল বলেছে, সরকারের একতরফা প্রচার গণভোটের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নির্বাচন বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, সরকারের পক্ষ নেওয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকছে না।
আইনি অবস্থান
নির্বাচন কমিশন বলছে, গণভোটে কোনো প্রার্থী বা দল না থাকলেও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। তবে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে কি না—সে বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ভোটের তারিখ ঘনিয়ে এলেও গণভোটের প্রশ্ন ও প্রভাব নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব এবং সরকারের একতরফা প্রচার—দুটোই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
পূর্বের পোস্ট :