‘ও (শরীফ ওসমান বিন হাদি) শাহবাগের মোড়ে যা বলে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও একই কথা বলে। হাদি এমন একজন ব্যক্তি, যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সম্পূর্ণটা দেশপ্রেম।’—এভাবেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির দেশের প্রতি টানের কথা তুলে ধরেন তাঁর বোনের স্বামী মনির হোসেন।
দৃঢ়তার সঙ্গে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ৩২ বছরের এই তরুণ সংগঠককে শুধু পরিবার নয়, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি পৌর শহরের বাসিন্দারাও ভয়ডরহীন ভূমিকার জন্য পছন্দ করতেন।
চব্বিশের আন্দোলনের সময়ই শুধু নয়, ছোটবেলা থেকেই যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করতেন হাদি—এমনটাই জানান তাঁর শিক্ষক, প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজন।
নলছিটি পৌর শহরের বাসিন্দা শাহাদাত আলম ফকির বলেন, ‘হাদি আমাদের নলছিটির সন্তান। ৫ আগস্টের পর থেকে সে দেশের জন্য লড়াই শুরু করেছিল; ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছিল। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় কথা বলেছে হাদি।’
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হাদি নিজের এলাকা নলছিটি উপজেলার মানুষের কাছে প্রিয়মুখ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। উপজেলার খাসমহল এলাকায় তাঁর প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান, ভদ্র ব্যবহার ও পরোপকারী স্বভাবের কারণে তিনি সবার পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
রাশিদা বেগম নামে এক এলাকাবাসী বলেন, ‘খুব ভালো ছেলে ছিল। এমন কেউ নাই, যার জন্য তার চোখের পানি পড়েনি। তাকে যে গুলি করেছে, তার আমরা বিচার চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাদি দালানে থাকত না, ভাঙা একটি টিনের ঘরে থাকত। চাইলে অনেক কিছু করতে পারত; কিন্তু করেনি। তাদের পরিবারের সবাই ভালো।’
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার জন্য হাদি অনেকের কাছে বিশেষ পরিচিতি পান। এরপর টকশো ও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন।
ইনকিলাব মঞ্চের এই আহ্বায়ক ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন জনসংযোগ কার্যক্রম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওসমান হাদির হাত ধরেই গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’—সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য।
ঝালকাঠির এনএস কামিল মাদ্রাসায় হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে; ২০১০–২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এনএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা গাজী মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, এই মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণি থেকে আলিম পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন হাদি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সুবক্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী।
সংগ্রামী জীবন
নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে শিক্ষাজীবনে এক সময় টিউশনি করেছেন হাদি। পরে কোচিং সেন্টার সাইফুরসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। সবশেষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব স্কলারসে শিক্ষকতা করছিলেন তিনি।
১৯৯৩ সালে জন্ম নেওয়া ওসমান হাদি তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। তাঁর মাদ্রাসা শিক্ষক বাবা মারা গেছেন। বড় ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিক বরিশাল গুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী শরফুদ্দীন আহম্মেদ সেন্টু প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব। মেজ ভাই মাওলানা ওমর ফারুক ঢাকায় ব্যবসা করেন।
হাদি বরিশালের রহমতপুরে বিয়ে করেন। তাঁর এক বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে।
হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর প্রতিবেশী নাছির খান বলেন, ‘হাদি ছোট থেকেই আমাদের এখানে বড় হয়েছে। কখনো খারাপ আচরণ করেনি। এলাকায় এলে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকত, খোঁজখবর নিত। হাদি যে এত জনপ্রিয়, তা আমরা কল্পনাও করিনি।’
স্থানীয় তরুণ রাকিব হোসেন বলেন, ‘হাদি ভাই এলাকায় এলে আমাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন।’
সব বয়সী শুভাকাঙ্ক্ষীকে শোকে ভাসিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুর থেকে আসে এই তরুণ রাজনৈতিক সংগঠকের মৃত্যুর খবর। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।
এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে রিকশায় যাওয়ার সময় ওসমান হাদির ওপর হামলা হয়। মোটরসাইকেলে এসে দুজন খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর চিকিৎসা চলছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়।
পূর্বের পোস্ট :