মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে অসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে স্বাধীন দেশের পতাকা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলার মানুষ। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১৬ ডিসেম্বর আবার ফিরে এসেছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয় লাল-সবুজের বাংলাদেশ। মঙ্গলবার উদযাপিত হচ্ছে মহান বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকী।
পাকিস্তানি শাসনামলের শোষণ-বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান ঘটে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর অগণিত মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে মঙ্গলবার দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত কর্মসূচি। সরকারি-বেসরকারি ভবনে উড়ছে জাতীয় পতাকা, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ শহীদ বেদীগুলো ভরে উঠছে শ্রদ্ধার ফুলে। বিজয়ের শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর হচ্ছে রাজপথ।
বিজয় দিবস উপলক্ষে এবার বিশেষ আয়োজন হিসেবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকা হাতে স্কাইডাইভিং করবেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস অফিস জানিয়েছে, এটি হবে বিশ্বের সর্বাধিক পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত হয় বাংলাভাষী এই ভূখণ্ড। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা যে টেকসই হবে না, তা তখনই স্পষ্ট হতে শুরু করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে বাঙালির ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়, যা ধীরে ধীরে স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা।
এই বিজয় দিবস এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেশের গতিপথ বদলে দিয়েছে। আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পথের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। বিজয়ের আনন্দের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরপরই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকার একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হাদির এই হামলার প্রেক্ষাপটে বিজয় দিবসের আয়োজনেও নিরাপত্তা গুরুত্ব পেয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত বা বিস্মৃত করার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, ‘ইতিহাসের ঘটনাবলী বিশ্লেষণে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাস পরিবর্তন করা যায় না কিংবা মুছে ফেলা যায় না।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের যুদ্ধ, যেখানে সাধারণ মানুষই ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠন। বর্তমান সময়ে সেই চেতনা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়লেও ইতিহাস বাংলাদেশের পক্ষেই রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ধর্ম, জাতিসত্তা ও সম্প্রীতির মিলনের পথ দেখিয়েছিল একাত্তরের অভ্যুদয়।
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক বাণীতে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বাণীতে বিজয় দিবসকে জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের শপথ নেওয়ার দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবার ভোরে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। দিনভর সারাদেশে আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কুচকাওয়াজ, বিজয়মেলা ও বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা ও উদযাপনে পালিত হবে মহান বিজয় দিবস।
পূর্বের পোস্ট :