হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ‘স্পেশাল কেয়ারে’ রাখা হয়েছে।

চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, সোমবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে খালেদা জিয়ার অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয়। সূত্রটি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে না চাইলেও জানায়, বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এরইমধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছেন। শারীরিক অবস্থা অনুকূল হলে তাঁকে বিদেশেও নেওয়া হতে পারে।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে সরকার আগেই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে, যাতে তাঁর নিরাপত্তায় বিশেষায়িত বাহিনী এসএসএফ মোতায়েন করা যায়। সোমবার রাতে এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। বসুন্ধরার বেসরকারি যে হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন, সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে এসএসএফ সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন। এসএসএফ দায়িত্ব নিলে বিএনপির নেতাকর্মীরা আর হাসপাতালে ভিড় করতে পারবেন না।

এভারকেয়ার হাসপাতালের চতুর্থ তলার একটি কেবিনে রয়েছেন খালেদা জিয়া। নিরাপত্তার কারণে ওই তলার বাকি কেবিনগুলো খালি করে দেওয়া হয়েছে।

চীনের পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল সোমবার রাতে ঢাকায় পৌঁছে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। তাঁরা কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি সঙ্গে এনেছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। বিএনপি নেতাদের দাবি, চীন ও সিঙ্গাপুর থেকে আজ মঙ্গলবার আরও কয়েকজন চিকিৎসকের আসার কথা রয়েছে।

ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল থেকেও একদল জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ওই হাসপাতালে গেছেন। সেখানে সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার জন্য একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দিতে সম্মত হয়েছে চীন। তাঁকে চীনেও নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। তবে খালেদা জিয়ার পরিবার, বিশেষ করে ছেলে তারেক রহমান, তাঁকে যুক্তরাজ্যে নিতে চান। তিনি ১৭ বছর ধরে সেখানেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

চীন থেকে আসা চিকিৎসক দল চিকিৎসা প্রতিবেদন পরীক্ষা করে জানিয়েছে, তাঁকে ‘বিপদমুক্ত করা অসম্ভব নয়’। তবে চীনা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হলে মাঝে জ্বালানি নিতে দুবাই বা অন্য কোনো বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করতে হবে। চলতি বছরের শুরুতে কাতারের আমিরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে খালেদা জিয়াকে সরাসরি লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল, এবার সেই সুবিধা নেই।

৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র ও চোখের জটিলতায় ভুগছেন। গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর বুকে সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং তাঁকে ভর্তি করা হয়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবার বলেন, তাঁদের চেয়ারপারসনের অবস্থা ‘সংকটময়’। এরপর থেকেই প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশবাসীর কাছে তাঁর জন্য দোয়া চেয়ে বিবৃতি দিচ্ছেন।

সোমবার রাতে দেশি–বিদেশি চিকিৎসকেরা যখন খালেদা জিয়ার অবস্থা পর্যালোচনা করছিলেন, তখন বিএনপির শীর্ষ নেতারা গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। পাশের কক্ষে অবস্থান নিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন দলের স্থায়ী কমিটিকে ব্রিফ করছিলেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমান।

বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, তারেক রহমান ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তাঁর জন্য শিগগিরই নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি চাইলে এক দিনের মধ্যেই ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে। তবে তারেকের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তিনি ট্রাভেল পাস নয়, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই ফিরতে চান।

সরকার ও বিএনপি উভয় সূত্র বলছে, পরিবারের নিকটতম সদস্য হিসেবে তারেক রহমানও এসএসএফের নিরাপত্তা পেতে পারেন। চিকিৎসকেরা যদি মনে করেন যে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাহলে তাঁর হয়তো আপাতত ঢাকায় ফিরতে হবে না।