শতবর্ষী স্থাপত্য ও সরু গলিপথ একদিকে যেমন পুরান ঢাকার ঐতিহ্য বহন করছে, তেমনি ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ সেখানে বসবাসের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পরের দিন আরও তিন দফা ভূমিকম্প পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দেওয়ার পরের কয়েক দিন পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
পুরান ঢাকার বিস্তৃত এলাকার মধ্যে বাংলাবাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, লক্ষ্মীবাজার, কলতাবাজার, নারিন্দা, বাবুবাজার, আরমানিটোলা—বেশির ভাগ এলাকাই ঘনবসতিপূর্ণ। শতবর্ষী ভবনগুলো যেন একটির সঙ্গে আরেকটি লেগে আছে।
২২ নভেম্বরের আরও তিন দফা ভূমিকম্পের পর বাসিন্দারা বুঝতে পারছেন, মৃদু বা মাঝারি মাত্রার কম্পনেও এসব ভবনের ঝুঁকি রয়েছে। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। আগের দিনের ভূমিকম্পে প্রথম প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটেছে পুরান ঢাকাতেই—একটি ভবনের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে মারা গেছেন তিনজন।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার বৃহস্পতিবার বিকেলে মৃদু মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশ। তার আগে গভীর রাতে দুটি ভূমিকম্প হওয়ার তথ্য দিয়েছে ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি)।
পুরান ঢাকার অধিকাংশ গলিতে এখনো যানবাহন ঢোকার মতো পর্যাপ্ত প্রশস্ততা নেই। শুধু মানুষের চলাচলের উপযোগী এসব গলি। যেকোনো দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারবে কি না, ঢুকলেও সঠিক স্থানে পৌঁছাতে পারবে কি না—এ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বাসিন্দারা অনিশ্চয়তায় আছেন।
নারিন্দার বেগমগঞ্জ লেনে ৩৫ বছর ধরে বসবাসকারী মোহাম্মদ রোবায়েত হোসেন বলেন, দুই দশক আগেও এ এলাকায় এত ভবন ছিল না। পুরনো ভবন ছিল, তবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এত বাড়ি ওঠেনি।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসার সূত্রে দীর্ঘদিন এই এলাকাতেই থাকছি। দুই দশক ধরে কোনো নিয়মকানুন না মেনে অপরিকল্পিতভাবে ভবন তৈরি হচ্ছে। ফলে গলিগুলো শুধু মানুষ চলার উপযোগী, আর যেগুলো রাস্তা বলা হয়, সেখানে দুটো রিকশা পাশাপাশি যাওয়া কষ্টসাধ্য।’
‘এজন্য কোনো বড় ধরনের দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান চালানোর উপায় দেখি না।’
রাজউকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্ট বা ফাটলরেখায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে।
আর ২১ নভেম্বরের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এই ভূমিকম্পে আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকায় একটি আটতলা ভবনের পাশের দেওয়াল ও কার্নিশ থেকে ইট–পলেস্তারা খসে পড়ে তিনজন মারা যান।
মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে—অনেক ভবনের ছাদ ও দেওয়াল থেকে নিয়মিত পলেস্তারা খসে পড়ছে। কসাইটুলির মতো দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে আছেন।
বংশালের আবুল খয়রাত সড়কে (তারা মসজিদ) রয়েছে জমিদার সুবহানের পুরনো বাড়ি—যা প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্কার–অভাব আর অবহেলায় ভবনটি এখন জরাজীর্ণ।
ভবনটি যেকোনো ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর। ঠিক উল্টো দিকে রয়েছে নওয়াব সলিমুল্লাহর একটি পুরনো বাড়ি—সেটিও কোনো সংস্কার ছাড়াই ব্যবহার হচ্ছে।
ষাটোর্ধ্ব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই এই দুইটা বাড়ি এমনই দেখি। সুবহানবাগের বাড়িতে আত্মীয় থাকেন, আর সলিমুল্লাহর বাড়ি এখন ভাড়া দেওয়া হয়।’
আতঙ্কে আরমানিটোলার বাসিন্দারা
তীব্র ভূমিকম্পে আরমানিটোলার কসাইটুলিতে ২০/সি কেপি ঘোষ স্ট্রিটে বাংলা স্কুলের সামনে ২০ নম্বর ভবনের রেলিং ভেঙে পড়ে তিনজন মারা যান।
ভবনের নিচে রয়েছে মাংসের দোকান ও রেস্তোরাঁ। দুর্ঘটনার সময় সেখানে ৪০–৫০ জনের ভিড় ছিল।
মাংসের দোকানের কর্মচারী মো. সজল বলেন, ‘শুক্রবার কাস্টমার বেশি ছিল। তাও আমরা বেঁচে গেছি উপরে বাসের ছাউনি দিয়ে তেরপল ছিল বলে। না হলে ২০–৩০ জন মারা যাইত।’
এরপর রাজউক দোকানগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় মালিক–কর্মচারীরা বেকার বসে আছেন।
এক ভাড়াটিয়া বলেন, ‘দৃশ্যটা দেখে গা শিউরে উঠেছিল। এখন প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকি। আরও অনেক ভবন আছে—কোনোটার রেলিং ভাঙেনি। মনে হয় এই ভবনের কাজ ভালো হয়নি। আমরা বাসা ছেড়ে দেব।’
স্থানীয়দের মতে, প্রায় ১৮ বছর আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ধাপে ধাপে তলা বাড়ানো হয়। উপরের অংশে চুনকামও নেই।
আইনজীবী নাজিম মিয়া বলেন, ‘পুরান ঢাকা সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ—আগুনেও, ভূমিকম্পেও। তবে রেলিং পড়ে মৃত্যুর পর ভয় আরও বেড়েছে।’
বেচারাম দেউরিতে হাজী নান্না বিরিয়ানির দোকানের উল্টো পাশে প্রায় দুইশ বছরের পুরনো তিনতলা একটি ভবন দেখা গেছে—অবস্থাও জরাজীর্ণ। বাসিন্দারা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।
৭৫ বছর বয়সী আহসান উল্লাহ বলেন, ‘হিন্দু পরিবারের মালিকানা। কেউ সংস্কার করে না। নিচে হোটেল–দোকান। দুর্ঘটনা হলে বহু প্রাণহানি হবে।’
সূত্রাপুরের বাসিন্দা শফিক মিয়া বলেন, ‘ভাড়াটিয়ারা চাইলে গ্রামে যেতে পারে। আমরা যেতে পারি না—এটাই শেষ ঠিকানা। শিশু আর নারীরা এখনও ভয় কাটাতে পারছে না।’
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘অব্যবস্থাপনার ফল—তিন পাশে ভবন, সামনে সরু গলি। দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ঢুকবে কি না, ঢুকলেও সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারবে কি না—অনিশ্চিত।’
তিনি মনে করেন, বড় ভূমিকম্পে “শত শত ভবনে উদ্ধার অভিযান চালাতে হতে পারে”, অথচ ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা সীমিত।
তিনি পুরান ঢাকার সংস্কার–অযোগ্য ভবন ভেঙে ফেলা, সংস্কারযোগ্য ভবনের দ্রুত সংস্কার, স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন এবং বিদ্যুৎ–গ্যাস নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রশিক্ষিত কর্মীরা ঝুঁকি মূল্যায়ন করবেন। ঝুঁকি বেশি হলে বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে ভবন ভেঙে ফেলা হবে।
তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ছয়তলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেব না। সরু গলি প্রশস্ত করা হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজউকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন সিটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বড় বিপর্যয় হলে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। তুরস্কের ভূমিকম্পেও বড় সরঞ্জাম ছাড়া কিছুই করা যায়নি।’
পূর্বের পোস্ট :