দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে গ্রামের কৃষক—শুক্রবারের ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছোটেননি এমন কেউ নেই। হুড়োহুড়িতে শারীরিক আঘাত পাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
বহু বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করলেও সরকারিভাবে ভূমিকম্প–প্রস্তুতি নিয়ে ‘নানা উদ্যোগের’ কথাই বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে শুক্রবারের ভূমিকম্পে ভবন থেকে নামতে গিয়ে বা লাফিয়ে পড়ে অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন এখনও গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় সামনে এসেছে প্রস্তুতি–সংকট এবং মানুষের সচেতনতার ঘাটতি। পাশাপাশি শনিবারের তিন দফা মৃদু ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভুল বার্তা তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
হুড়োহুড়িতে গুরুতর আহতরা
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সুবহান মিয়া দোকান থেকে বের হতে গিয়ে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে পা ভেঙেছেন। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের মেঝেতেই তাঁর চিকিৎসা চলছে।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে—আগের সচেতনতা কার্যক্রম ‘যথেষ্ট নয়’। সোমবার প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে ভূমিকম্প–প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে।
অন্যদিকে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র বলেছে—শনিবারের ভুল তথ্য ‘অনিচ্ছাকৃত মানবীয় ভুল’। তাদের দাবি, এটি সক্ষমতার ঘাটতি নয়; অনেক দেশেই ভূমিকম্পের তথ্য পরে সংশোধনের নজির রয়েছে।
দুই যুগে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে বাংলাদেশ। এতে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন ছয় শতাধিক মানুষ। ঢাকার বহু ভবনে ফাটল দেখা দেয়।
উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদী, কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেদিন ছাদ বা সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে–দৌড়ে নামতে গিয়ে ছয়জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হন। ঢাকাসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে অনেকে হাত–পা ভেঙে গুরুতর আহত হন।
নরসিংদীর কাজীরচর নয়াপাড়ায় ৬৫ বছরের নাসির উদ্দিন ফসলি জমি থেকে দৌড়াতে গিয়ে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
‘সচেতনতার বড় ঘাটতি’—বিশেষজ্ঞরা
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ‘সবারই কমবেশি নেগলেসেন্সি আছে। যে যতই বলুক, কাজের কাজ কিছুই করেনি। ২০৩০ সালের মধ্যে বড় ভূমিকম্প হবেই। এখনই সচেতনতা বাড়াতে হবে, নিয়মিত মহড়া করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মানছেন—তাঁদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।
হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজিম বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে কী করণীয় জানি না বলেই এমন হয়েছে। প্র্যাক্টিক্যাল ধারণা নেই।’
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী প্রভা বলেন,
‘বেশিরভাগ হলই পুরনো ও দুর্বল ভবন। সবাই ভাবে, বাইরে দৌড়ে গেলে বাঁচার সম্ভাবনা বেশি। তাই হুড়োহুড়িতে আহত হচ্ছেন।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের জেবা তাহসিন বলেন,
‘সিঁড়ি যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ—এটা জানতাম না। আতঙ্কে সেদিকেই দৌড়েছিলাম।’
দুদিনে চার ভূমিকম্প ও শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার পর রোববার ১৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান—ছুটি শেষে শিক্ষার্থীদের ভূমিকম্প–প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
জনপর্যায়ে আতঙ্ক–দৌড়ঝাঁপ
নরসিংদীর বাসিন্দা আরাফাত শাহ বলেন, ভূমিকম্পে তাঁদের চারতলা বাড়ির টাইলস ভেঙে পড়েছে। ‘সবাই বেঁচে গেলেও এখন আতঙ্কে আছি।’
একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ বলেন,
‘টুকটাক কিছু জানি, কিন্তু আতঙ্কে মাথায় কিছুই থাকে না। ঢাকার মতো শহরে দৌড়ে নিচে গেলেই কি নিরাপদ? বরং নামতে গিয়েই অনেকে আহত হচ্ছেন।’
সচেতনতা নিয়ে সরকারের অবস্থান
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে বলেন,
‘ঢাকা–চট্টগ্রামে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম হয়েছে। নাটিকা, লিফলেটও আছে। কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়।’
সোমবারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিশেষজ্ঞদের মতামত শোনেন এবং সবাইকে লিখিত সুপারিশ দিতে বলেছেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত হবে।
অধ্যাপক মেহেদি আনসারী জানান,
‘একটি ন্যাশনাল লেভেলের ইনস্টিটিউট পাইপলাইনে আছে। অনুমোদন হলে সেই প্রতিষ্ঠানের অধীনেই সব কাজ হবে।’
বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে—ভূতত্ত্ববিদদের সতর্কতা
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন,
‘বিপদজনক মাত্রায় পৌঁছেছে ঝুঁকি—জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অভাবে। ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব না, কিন্তু ক্ষতি কমানো সম্ভব।’
তাঁর পরামর্শ—
সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি
নিয়মিত ভূমিকম্প–মহড়া
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুক্ত করা
তিনি বলেন,
‘আজকাল সবাই ভূমিকম্প–বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন। সোশাল মিডিয়ায় ভুল ব্যাখ্যা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে—এটিও বড় বিপদ।’
‘ভুল বার্তা’ নিয়ে প্রশ্ন
শুক্রবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর শনিবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে রিখটার স্কেলে ৩.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে আবার কেঁপে ওঠে দেশ। প্রথমে উৎপত্তিস্থল বলা হয় সাভারের বাইপাল, পরে সংশোধন করে নরসিংদীর পলাশ বলা হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঢাকার বাড্ডায় দুটি ভূমিকম্পের তথ্য জানানো হলেও পরে আবার সেটি সংশোধন করা হয়।
পূর্বের পোস্ট :