ঢাকার কাছে নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প যে ক্ষতি করেছে, সেটি ৭ মাত্রায় হলে কী ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতো—তা কল্পনা করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী। তিনি বলেন, এই ভূমিকম্পটিকে ‘ফোরশক’ বা বড় ভূমিকম্পের আগাম সংকেত ধরা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভূত্বকগঠনে দুটি বড় প্লেট—ইন্ডিয়ান ও বার্মা প্লেট—সংঘর্ষ অবস্থায় রয়েছে। এ অঞ্চল দীর্ঘদিন শক্তি সঞ্চয় করে রাখায় বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিদ্যমান। অধ্যাপক আনসারীর মূল্যায়ন, ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ২ থেকে ৩ লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং ভেঙে পড়তে পারে রাজধানীর অন্তত ৩৫ শতাংশ ভবন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, এবারের ভূমিকম্পটি ইন্ডিয়া-বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে হয়েছে, যেখানে বহু দিন ধরে চাপ জমা ছিল। তার মতে, ওই অঞ্চলে ৮ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার শক্তি এখনো ভূত্বকের নিচে আটকানো আছে। তিনি একে ‘ওয়েকআপ কল’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের ভূমিকম্পে তিন জেলায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু ও ছয় শতাধিক আহতের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার আরমানিটোলায় কার্নিশ ধসে তিনজন এবং মুগদায় নির্মাণাধীন ভবনের রেলিং পড়ে একজন নিহত হন। নরসিংদীতে পাঁচজন ও নারায়ণগঞ্জে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গাজীপুরে কারখানাগুলোতে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে চার শতাধিক শ্রমিক আহত হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বড় ভূমিকম্প ঠেকানো না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য ভবনের মান যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, নাগরিক সচেতনতা ও নিয়মিত মহড়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। অধ্যাপক আনসারী বলেন, ঢাকার ২১ লাখ ভবনের মানপরীক্ষা করে ‘রেড বিল্ডিং’ শনাক্ত করা জরুরি। হুমায়ুন আখতার রাজধানী বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে মত দিয়ে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পশ্চিমাঞ্চলে সরিয়ে নিলে বড় বিপর্যয়েও দ্রুত উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
অতীত রেকর্ড বলছে, এই অঞ্চলে দেড়শ বছর পরপর ৭ মাত্রার এবং আড়াইশ থেকে তিনশ বছর পর ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ১৮৯৭ সালে এখানে ৮ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ছোট-বড় ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বড় ভূকম্পনের পূর্বাভাস হতে পারে।
এ অবস্থায় করণীয় বিষয়ে তারা বলেন—ভূমিকম্প অনুভূত হলে দ্রুত খোলা জায়গায় যেতে হবে, না পারলে পাকা ঘরের কোণে বা শক্ত টেবিল-ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। এলিভেটর ব্যবহার না করা, বাড়তি নড়াচড়া এড়ানো এবং ‘ড্রপ–কাভার–হোল্ড’ পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। তারা মনে করেন, সারাদেশে নিয়মিত মহড়া ছাড়া বড় ধরনের প্রস্তুতি সম্ভব নয়।
পূর্বের পোস্ট :