মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা না করে শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়।
বুধবার নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। তবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।” রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তৈরি হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন-রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের প্রভাব কাজে লাগাতে হবে।
তিনি রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এসব নিশ্চিত করা গেলে রোহিঙ্গাদের মধ্যেও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আস্থা তৈরি হবে বলে তিনি বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দিচ্ছে। তরুণ রোহিঙ্গাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা রাখাইন রাজ্যে ফিরে গিয়ে সমাজে পুনঃএকীভূত হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিনের এই বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের ওপর, বিশেষ করে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর, ক্রমবর্ধমান সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ তৈরি করছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও তিনি সতর্ক করেন। জীবন ঝুঁকিতে ফেলে কিছু রোহিঙ্গার নৌপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
তিনি রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকেও অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।
এ ছাড়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক।” প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি অধ্যায় না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে।
পূর্বের পোস্ট :