প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে র্যাশ—কচি হাতে ক্যানুলা আর নাকে নল নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাঁদছে ছোট্ট ইনায়া। মাত্র নয় মাস বয়সী এই শিশুর অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার মা ও দাদি। কখনো নার্স, কখনো চিকিৎসক, আবার কখনো ওষুধের দোকানে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা।
শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। ইনায়ার মতোই প্রায় প্রতিটি শিশুই গুরুতর অবস্থায় ভর্তি রয়েছে।
বুধবার দেখা যায়, ৬০ শয্যার এই বিশেষায়িত ওয়ার্ডের সবকটি বেড রোগীতে পরিপূর্ণ। এর মধ্যে ১৬টি আইসিইউ থাকলেও অনেক গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউ সুবিধা পাচ্ছে না। ফলে ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর ১১টা থেকে বুধবার দুপুর ১১টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৭ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। আগে থেকেই ভর্তি ছিল ৬১ জন। বর্তমানে মোট ৭৮ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এপ্রিলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর একজন রয়েছে লাইফ সাপোর্টে।
আইসিইউ বাড়ানোর দাবি অভিভাবকদের
হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা থেকে ঢাকায় শিশু হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে। অনেক শিশুর অবস্থা গুরুতর হলেও আইসিইউ না পেয়ে ওয়ার্ডেই চিকিৎসা চলছে। এ অবস্থায় আইসিইউ ও শয্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
ইনায়ার মা মীম আক্তার বলেন, “শুরুতে ডাক্তাররা হাম বলেননি। কিন্তু কয়েকদিন পর অবস্থার অবনতি হলে আবার হাসপাতালে আনতে হয়, তখন ভর্তি নেয়।”
দাদি মোর্শেদা আক্তার বলেন, “বাচ্চার আইসিইউ প্রয়োজন, কিন্তু পাচ্ছি না। চিকিৎসার জন্য এসে এত ভোগান্তি হবে ভাবিনি। জীবন-মৃত্যুর জায়গায় উন্নয়ন সবার আগে দরকার।”
ভোলা থেকে আসা মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে। পরে এখানে আইসিইউ পেয়ে তার সন্তান এখন কিছুটা সুস্থ।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা তাসলিমার মা সোনিয়া আক্তার বলেন, “হাসপাতালে অক্সিজেনসহ চিকিৎসা মিলছে, কিন্তু বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে ভোগান্তি বাড়ছে।”
ঈদের পর থেকেই বাড়ছে চাপ
হাসপাতালটির সিনিয়র স্টাফ নার্স দোলা জানান, রোগীর চাপের কারণে প্রতিদিন অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। আইসিইউ থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের বাইরেও রোগীর চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বলেন, “রোজার ঈদের পর থেকেই রোগীর চাপ বেড়েছে। তাই বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, হামের টিকা সাধারণত ৯ ও ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। কিন্তু এর আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, যা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
হামের লক্ষণ ও সতর্কতা
চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণ হলো জ্বর, সর্দি ও শরীরে র্যাশ। তবে জ্বর, র্যাশ এবং অস্বাভাবিক শ্বাস একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
এছাড়া শিশুদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না নেওয়া এবং সংক্রমণ থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, তাই দ্রুত স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
পূর্বের পোস্ট :