উদ্ভ্রান্তের মতো মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটোছুটি করছিলেন টঙ্গী থেকে আসা মো. শরিফ।

তার তিন মাসের ছেলে আয়ানের হাম হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, তার অবস্থা ‘ভালো নয়’; প্রয়োজন আইসিইউ। কিন্তু এ হাসপাতালে কোনো আইসিইউ বেড খালি নেই।

শরিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাচ্চার অবস্থা খারাপ। আপাতত এখানে ভর্তি রেখেছি। অন্য হাসপাতালে আইসিইউ খালি আছে কিনা খোঁজ নিচ্ছি।”

হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় সারা দেশ থেকে আক্রান্ত শিশুরা আসছে মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে। আইসিইউ বেড তো খালি নেই, সাধারণ ওয়ার্ডেও জায়গা না থাকায় মেঝেতেই চলছে চিকিৎসা। জরুরি বিভাগ থেকে রোগীর স্বজনদের বিষয়টি জানিয়েই ভর্তি নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গল ও বুধবার রাজধানীর এ হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের নিয়ে স্বজনদের দীর্ঘ লাইন। চিকিৎসক ও সেবিকারা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের রোগী আসতে শুরু করে গত জানুয়ারিতে। মার্চে, ঈদের আগে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে।

আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। বিভিন্ন জেলায় হাম বা এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ ছাড়িয়েছে।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শাহজাহান নাজির বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের কম।

“আমাদের দেশে হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস পার হলে। কারণ মায়ের অ্যান্টিবডি শিশুকে ওই সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এখন আর সেটা কার্যকর থাকছে না,” বলেন তিনি।

তিনি আরও জানান, শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, “হামের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে এই মুহূর্তে বড় সংকট হচ্ছে এনআইসিইউ সুবিধার অভাব।”

তিনি জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বড় হাসপাতালগুলোতেও এখনো এনআইসিইউ সুবিধা নেই।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি, হাঁচি ও বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি—এগুলো এর প্রধান লক্ষণ।

সঠিক চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), কানে সংক্রমণ বা মারাত্মক পানিশূন্যতার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি জরুরি।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই; উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। সময়মতো এমএমআর টিকা নেওয়াই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ।

ধারণক্ষমতার বাইরে হাসপাতাল

মাদারীপুরের শিবচরের ১৩ মাস বয়সী হাবিবা বর্তমানে মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ভর্তি।

তার বাবা হাবিবুর শেখ বলেন, “এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে আছে। হাম ও চিকেন পক্স একসঙ্গে হয়েছে। এখন কিছুটা ভালো।”

অন্যদিকে ৯ মাস বয়সী মিনহাজের বাবা মো. সুজন বলেন, “বেড পাইনি। মেঝেতেই চিকিৎসা চলছে। প্রথমে জ্বর ভেবে বাসায় ছিলাম, পরে পরীক্ষা করে হাম ধরা পড়ে।

মিরপুর থেকে আসা মোরশেদা আক্তার বলেন, “প্রথমে বুঝিনি। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখে হাসপাতালে এনেছি। এখন কিছুটা ভালো।”

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান জানান, হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হলেও অন্যান্য রোগী থাকায় কার্যত খুব কম বেড ফাঁকা থাকে। ফলে বাধ্য হয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

সমন্বিত তথ্যের অভাব

সারাদেশে মোট কতজন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি—এমন নির্দিষ্ট তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেও নেই।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৬৮৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে উপসর্গ থাকা বা সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

জেলায়-জেলায় ছড়াচ্ছে সংক্রমণ

ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন বিভাগে প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর খবর আসছে।

বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, শত শত শিশু বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার সুবিধা সীমিত থাকায় রোগীদের ‘সাসপেক্টেড’ হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

করণীয় কী

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার সংক্রমণ বেশি হচ্ছে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে।

তাদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ঘাটতি এবং অনেক শিশুর দ্বিতীয় ডোজ টিকা না নেওয়াই এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেন, “শিশুকে ৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হবে। কোনো ডোজ বাদ পড়লে দ্রুত পূরণ করতে হবে।”

আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পর্যাপ্ত তরল খাবার দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।

রোববার থেকে টিকাদান কর্মসূচি

সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আগামী রোববার থেকে হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকায় অগ্রাধিকার দিয়ে তা সরবরাহ করা হবে।

এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।

এছাড়া হামের সঙ্গে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু কমাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা শিশুদের শ্বাসকষ্ট কমাতে সহায়ক হতে পারে।