ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলমান বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ না হওয়ায় এ পথে চলাচলকারী যাত্রীদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ঈদ সামনে রেখে গাজীপুর অংশে যানজটের শঙ্কা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল চার বছর এক মাস। তবে নানা জটিলতায় প্রকল্পটির সময়সীমা ইতোমধ্যে পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে।
সর্বশেষ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে মহাসড়কের মাঝখানে থাকা বিআরটি লেন ও এর দুপাশে স্থাপিত বেষ্টনীর কারণে দুর্ঘটনা বা গাড়ি বিকল হলে দ্রুত উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (ট্রাফিক) অমৃত সূত্রধর জানান, মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ের পশ্চিমে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের কিছু স্থানে খানা-খন্দক রয়েছে। ঈদের আগে এসব অংশ মেরামত না হলে যানবাহনের গতি ধীর হয়ে যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি সড়ক ও জনপথ বিভাগকে জানানো হলেও বাজেট সংকটের কারণে দ্রুত মেরামত সম্ভব হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।
ঈদের সময় গাজীপুর থেকে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়লেও পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় কিছু চালক মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি নিয়ে সড়কে নামেন। মাঝপথে এসব যানবাহন বিকল হওয়া বা দুর্ঘটনায় পড়ার কারণে মহাসড়কে যানজট আরও বাড়ে।
ঢাকা–শেরপুর রুটে চলাচলকারী ‘এমা পরিবহনের’ চালক মোকছেদ মিয়া বলেন, গাজীপুরের বাঘের বাজার, নয়নপুর বাজার, জৈনাবাজার ও এমসি বাজার এলাকায় মহাসড়কের বড় অংশ দখল করে রেখেছে কাঁচামাল ব্যবসায়ী ও হকাররা। এছাড়া সড়কের পাশে দোকানপাট ও অটোরিকশার কারণে বাসসহ অন্যান্য যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ঈদের আগে কেনাকাটার ভিড় বাড়লে ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
ময়মনসিংহগামী থ্রি-স্টার ট্রাভেলসের বাস হেলপার সাব্বির হোসেন বলেন, ভালুকা ও ভরাডোবা এলাকায় সড়কের অবস্থা খারাপ। দ্রুত মেরামত না হলে ঈদের সময় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।
যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেইট, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, ভবানীপুর, বাঘের বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজার এলাকায় যানজটের আশঙ্কা বেশি। এছাড়া চান্দনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভার পুরোপুরি চালু না হওয়ায় এ এলাকাতেও ভোগান্তি হতে পারে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ঈদের আগে পোশাক কারখানাগুলো ছুটি দিলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক একসঙ্গে গ্রামে যাওয়ার জন্য সড়কে নামেন। এতে যানবাহনের তুলনায় যাত্রীর চাপ বেড়ে যায় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকায় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইওয়ে এখনও চালু হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার এটি খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চালু হলে যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যানজট নিরসনে ইতোমধ্যে পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে বলে জানান আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, ঈদে ভাড়া বৃদ্ধি রোধ এবং যানবাহন যাতে যত্রতত্র না থামে সে বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাদা পোশাক ও পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সড়কে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতি বছর ঈদযাত্রায় এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে। বিশেষ করে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে যানজটের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
তবে জেলা ও মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শফির উদ্দিন বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে এবং যাত্রীরা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
এদিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সভায় গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ এবং ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পূর্বের পোস্ট :