আশি দশকে বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে এক ম্রো কিশোরের হাতে যে বর্ণমালার জন্ম হয়েছিল, সেই ম্রো ভাষা এখন ডিজিটাল জগতে স্থান করে নিয়েছে। গুগল প্লে স্টোরে যুক্ত হয়েছে ম্রো ভাষার কি-বোর্ড; কম্পিউটারেও ব্যবহার করা যাচ্ছে এ বর্ণমালা। ছাপা হচ্ছে বই, লেখা হচ্ছে গল্প-প্রবন্ধ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে।
কয়েক বছর আগেও ম্রো ভাষা ছিল মূলত মৌখিক। কাগজ-কলমে সীমিত পরিসরে ব্যবহার হলেও প্রযুক্তিতে এর উপস্থিতি ছিল না। ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে প্রতিদিন একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ম্রো ভাষার প্রযুক্তিতে যুক্ত হওয়া টিকে থাকার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ম্রো জনগোষ্ঠী এখন একই বর্ণমালায় ভাষা চর্চা করছে।
ম্রো ভাষার বর্ণমালা প্রবর্তন করেন বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতি ইউনিয়নের ক্রামাদি পাড়ার বাসিন্দা মেনলে ম্রো। ১৯৮২ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি এ বর্ণমালা তৈরি করেন। তখন তিনি সুয়ালক ইউনিয়নের ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে ১৯ বছর বয়সে তিনি হঠাৎ নিরুদ্দেশ হন। এখনো তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
বর্ণমালা প্রবর্তনের পর মেনলে ম্রো বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। ‘ম্রো ভাষা শিক্ষা কমিটি’ গঠন করে বর্ণমালা শেখানো হতো। বর্তমানে কিছু এলাকায় এ কার্যক্রম সক্রিয় থাকলেও কোথাও কোথাও অনিয়মিত।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০২৩ সালে কয়েকটি আদিবাসী ভাষাকে কম্পিউটার কি-বোর্ড ও গুগল প্লে স্টোরে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। ভাষা প্রযুক্তিবিদ সমর এন সরেন জানান, প্রথমে চাকমা, মারমা, ম্রো ও সাঁওতালি ভাষা যুক্ত করা হয়। পরে মাহালি ও মাল্টো ভাষাও অন্তর্ভুক্ত হয়। চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ‘ইউবোর্ড’ নামে অ্যাপটি অবমুক্ত করা হয়। এখন যে কেউ এটি ডাউনলোড করে ছয়টি ভাষায় লিখতে পারছেন।
এর আগে ‘কেইমেন’ নামে একটি অ্যাপের মাধ্যমে ম্রো ভাষা লেখা হতো। লামা উপজেলার পোপা মৌজার হেডম্যান যোহন ম্রো জানান, তিনি এখনও ওই ফন্ট ব্যবহার করেন। বই ছাপা ও বিভিন্ন লেখালেখিতে সেটিই তার কাছে সুবিধাজনক।
ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াঙান ম্রো বলেন, ম্রো বর্ণমালায় ৩১টি স্বরবর্ণ রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন ও শান রাজ্যের ম্রোরাও এ বর্ণমালা ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ থেকে বই সংগ্রহ করে নিয়ে যান তারা।
ডিজিটাল মাধ্যমে ভাষা চর্চা বাড়ছে বলেও জানান মেলকম ম্রো নামের এক উন্নয়নকর্মী। তিনি বলেন, এখন নিয়মিত ম্রো ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখা যায়। এতে ভাষা ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে।
বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেকরু ম্রো জানান, তিনি কোর্স করে ম্রো ভাষা শিখেছেন এবং মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন।
ম্রো ভাষার প্রশিক্ষক ঙানসিং ম্রো বলেন, নিজেদের উদ্যোগে বই ছাপিয়ে শিশুদের বর্ণমালা শেখানো হচ্ছে। সম্প্রতি ম্রো ভাষায় গণিতের একটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। ৪০ পৃষ্ঠার বইটির প্রথম ধাপে ৪০০ কপি ছাপানো হয়েছে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক নুক্রাচিং মারমা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে দুই মাসের ম্রো ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। প্রতি ব্যাচে ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেয়। শিগগিরই নতুন ব্যাচ শুরু হবে।
চিম্বুক পাহাড়ের এক কিশোরের হাতে জন্ম নেওয়া বর্ণমালা এখন বই, কম্পিউটার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে—ম্রো ভাষার জন্য এটি এক নতুন অধ্যায়।
পূর্বের পোস্ট :