জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রায়ের বাজারে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ১১৪ জনের মৃতদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন আজ রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কার্যক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে ইতিমধ্যে ৯টি পরিবার ডিএনএ নমুনা প্রদান করেছে। পরীক্ষার মাধ্যমে এর মধ্যে আটজন শহিদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শনাক্ত হওয়া প্রত্যেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিহত হন বলে নিশ্চিত করেছে সিআইডি।
শনাক্ত হওয়া শহিদরা হলেন—সোহেল রানা (৩৮), রফিকুল ইসলাম (৫২), আসাদুল্লাহ (৩২), মাহিন মিয়া (৩২), ফয়সাল সরকার (২৬), পারভেজ বেপারী (২৩), কাবিল হোসেন (৫৮) এবং রফিকুল ইসলাম (২৯)।
কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে সিআইডির উদ্যোগে মানবাধিকার ও মানবিক কর্মকাণ্ডে ফরেনসিক বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ ড. মরিস টিডবাল বিনজ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, জুলাই–আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনে অংশ নিয়ে যেসব ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সিআইডির হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১৯৯৯৯-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এই কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন সরকার যে বর্বরতা চালিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যা করে গণকবর দেওয়ার মতো ঘটনা কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কল্পনাও করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, সত্য উদঘাটন ও শহিদদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নিখোঁজ পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই ডিএনএ শনাক্তকরণ কার্যক্রম প্রমাণ করে—সত্যকে চিরদিন চাপা দেওয়া যায় না। নিহতদের নাম ও পরিচয় ফিরে আসবে, আর তাঁদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ কেবল একটি ফরেনসিক কার্যক্রম নয়; এটি নিখোঁজ পরিবারের চোখের পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা, রাষ্ট্রের মানবিক মুখ পুনরুদ্ধার এবং ন্যায়বিচারের পথে একটি সাহসী পদক্ষেপ। যারা এখনো প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষায় আছেন, তাঁদের জন্য এই কার্যক্রম আশার আলো—একদিন সত্য সামনে আসবেই।
বৈঠকে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, একজন শহিদের মা নিয়মিত সিআইডিতে এসে খোঁজ করতেন। তিনি রায়ের বাজারে গিয়ে একটি গাছের নিচে থাকা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আশ্চর্যজনকভাবে ওই গাছের নিচেই তাঁর সন্তানের মরদেহ পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলেই ল্যাব স্থাপন করে যেভাবে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাতে পুলিশের ফরেনসিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেসুর রহমান, সিআইডির ডিআইজি মো. জমশের আলী, ডিআইজি মিয়া মাসুদ করিম, এসএসপি মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, ডেপুটি চিফ ডিএনএ অ্যানালিস্ট আহমাদ ফেরদৌস এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিনিধি মো. জাহিদ হোসেন।
পূর্বের পোস্ট :