দীর্ঘ ২১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে ঐতিহাসিক জয় পেল বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ জয় পায় ৮৬ রানের বড় ব্যবধানে। এই জয়ের মাধ্যমে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।
ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের প্রধান নায়ক ছিলেন প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন এবং তরুণ পেসার নাহিদ রানা। ব্যাট, বল ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মোসাদ্দেক। অন্যদিকে গতির ঝড়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে ধসিয়ে দেন নাহিদ রানা।
মোসাদ্দেকের রূপকথার প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেন খেলেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস। দলের চাপের মুহূর্তে ক্রিজে নেমে ৭০ বলে ৮৬ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা।
শুধু ব্যাটেই নয়, বল হাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মোসাদ্দেক। তিনি ২টি উইকেট নেন এবং ফিল্ডিংয়ে একটি দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে দলের জয়ের ভিত গড়ে দেন। তার এই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য তাকে ম্যাচসেরা নির্বাচিত করা হয়।
নাহিদ রানার গতির ঝড়
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ত্রাস ছড়ান তরুণ পেসার নাহিদ রানা। ইনিংসজুড়ে তিনি ৪টি উইকেট শিকার করেন। বিশেষ করে জশ ইংলিস, অ্যালেক্স কেয়ারি এবং ম্যাট রেনশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানদের বিদায় ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ভেঙে দেন তিনি।
তার গতি ও বাউন্সে বারবার বিপাকে পড়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা, যার ফলে বড় জুটি গড়তে ব্যর্থ হয় সফরকারীরা।
বাংলাদেশের ইনিংস: ধীর শুরু, শক্তিশালী সমাপ্তি
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ শুরুতেই ধাক্কা খায়। দ্বিতীয় ওভারেই সাইফ হাসান আউট হয়ে গেলে চাপ বাড়ে। তবে এরপর তানজিদ হাসান ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দারুণ ব্যাটিংয়ে ইনিংস মেরামত করেন।
তানজিদ হাসান ৪৪ বলে ৫৪ রানের ইনিংস খেলেন, আর শান্ত ৮৬ বলে ৬৭ রান করেন। দুজনের মধ্যে ৯৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ওঠে।
মধ্যপর্বে কিছুটা ধাক্কা খেলেও মোসাদ্দেক হোসেন একপ্রান্ত আগলে রেখে ইনিংসকে এগিয়ে নেন। তার সঙ্গে তাওহিদ হৃদয় ৭৫ রানের জুটি গড়েন, যা দলের বড় সংগ্রহের ভিত তৈরি করে।
শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের ১৬ বলে ২০ রানের কার্যকর ইনিংসে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান তোলে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়
২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ওভারেই ম্যাথু শর্ট আউট হন। এরপর দ্রুতই মার্নাস লাবুশেন ও অন্যান্য ব্যাটসম্যানরা ফিরে যান।
জশ ইংলিস ১৯ রানে নাহিদ রানার শিকার হন। কুপার কনোলি ৩৫ রান করলেও মোসাদ্দেক তাকে বোল্ড করে দেন। অ্যালেক্স কেয়ারি ও ম্যাট রেনশও ব্যর্থ হন বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে।
শেষ দিকে ক্যামেরন গ্রিন ৫২ রানে অপরাজিত থাকলেও একা লড়াই করে দলকে জেতাতে পারেননি। ৪২.২ ওভারে ১৯১ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশের হয়ে নাহিদ রানা নেন ৪ উইকেট, মোসাদ্দেক ২ উইকেট এবং মুস্তাফিজুর রহমান ২ উইকেট শিকার করেন।
ঐতিহাসিক জয় ও পরিসংখ্যান
এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০০৫ সালের কার্ডিফে পাওয়া বিখ্যাত জয়ের পর প্রথমবার ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল। একইসঙ্গে ১৫ ম্যাচ ও ২১ বছরের দীর্ঘ জয়খরা শেষ হলো।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৮৪/৮
তানজিদ ৫৪, শান্ত ৬৭, মোসাদ্দেক ৮৬*, হৃদয় ৩১
অস্ট্রেলিয়া: ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯
গ্রিন ৫২*, কেয়ারি ৪৭, কনোলি ৩৫
ফল: বাংলাদেশ ডিএলএস পদ্ধতিতে ৮৬ রানে জয়ী
সিরিজ: বাংলাদেশ ১-০ তে এগিয়ে
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মোসাদ্দেক হোসেন
পূর্বের পোস্ট :