ঢাকায় মশার দাপট কমাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করছে দুই সিটি করপোরেশন। তবে বাস্তবে মশার উৎপাত কমেনি বলে জানিয়েছেন নগরবাসী। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়ে না; কোথাও কোথাও কয়েক দিনেও ওষুধ ছিটাতে দেখা যায় না।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনির বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, “মশার জন্য এখানে দাঁড়ানোই দায়। আপনি দাঁড়িয়ে দেখেন, কত মশা।” তবে টানা কয়েক দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে মশা কিছুটা কমেছে বলেও জানান তিনি।
একই কথা বলেন সেগুনবাগিচার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন। তাঁর ভাষায়, “সিটি করপোরেশনের কারণে মশা কমেছে—এটা ঠিক না। বৃষ্টির কারণেই কিছুটা কমেছে।”
এ পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি অস্বীকার করেননি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি বলেন, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বৃষ্টিতেও মশা কিছুটা কমেছে।
মাঠে কার্যক্রম কম, অভিযোগ নাগরিকদের
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বকশীবাজার, চানখাঁরপুল, পলাশী, সেগুনবাগিচা, কাকরাইলসহ দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেও মশক নিধন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। একই চিত্র দেখা গেছে উত্তর সিটির মহাখালী, আমতলী, তিতুমীর কলেজ ও ওয়্যারলেস গেট এলাকাতেও।
বকশীবাজারের এক বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, “আগে প্রতিদিন দুইবার মশার ওষুধ দিত। এখন ছয়-সাত দিনেও দেখা যায় না।”
মিরপুরের এক বাসিন্দার অভিযোগ, গত ১৫ দিনেও বিকালে মশা মারার ওষুধ ছিটাতে দেখেননি।
তবে দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তাদের দাবি, যেসব এলাকায় কর্মীদের দেখা যায়নি, সেখানে সেদিন প্রশিক্ষণ চলছিল।
গবেষণায় মশার ঘনত্ব বেড়েছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির মশা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিষ্কার নালা, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মশার বিস্তার বাড়ছে। শুধু ওষুধ প্রয়োগে এর সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা।
ওষুধ কার্যকর, কিন্তু প্রয়োগে ঘাটতি
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সকালে লার্ভা ধ্বংসে টেমিফস এবং বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে ম্যালাথিয়ন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরীক্ষাগারে এসব ওষুধ কার্যকর হলেও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
এক কর্মকর্তা বলেন, “যেসব মশার গায়ে সরাসরি ধোঁয়া লাগে, সেগুলো মরে। কিন্তু অনেক মশা থেকেই যায়।”
ডোবা-নালাই বড় কারণ
দক্ষিণ সিটির তথ্য অনুযায়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী ও খিলগাঁও এলাকায় ডোবা-নালা বেশি থাকায় মশার উপদ্রবও বেশি।
উত্তর সিটির এক কর্মকর্তা বলেন, বস্তি, জলাশয় ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা
এখনো ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব না দেখা গেলেও সামনে বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে শঙ্কা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
দুই সিটি করপোরেশনই এখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ডোবা-নালা পরিষ্কার ও বিশেষ কার্যক্রম চালানোর কথা বলছে তারা।
দাবি-বাস্তবতার ফারাক
সিটি করপোরেশনের দাবি—মশা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। নিয়মিত কার্যক্রম না থাকা, তদারকির ঘাটতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে মশার ভোগান্তি এখনো কমেনি।
নগরবাসীর প্রশ্ন, কাগজে-কলমে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কবে দেখা যাবে?
পূর্বের পোস্ট :