ওয়াশিংটন/তেহরান: পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর নৌ-অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যাঞ্চলীয় কমান্ড জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবরোধ কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কিছু মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলে অবস্থান করবে।
চুক্তির পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থ রক্ষার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর তিনি চুক্তিটি অনুমোদন করেছেন।
খামেনি বলেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, চুক্তির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইরানি জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি সম্পন্ন করতে সব ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছেন। তবে ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হলেও তা কোনোভাবেই শত্রুপক্ষের শর্ত মেনে নেওয়ার সমতুল্য হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে মার্চ মাসে মুজতাবা খামেনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলেন।
এদিকে চুক্তি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আশা প্রকাশ করেছেন যে, লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতসহ অঞ্চলের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন।
চুক্তির আওতায় মোট ১৪টি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ করবে না—এ মর্মে অঙ্গীকার, এবং ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা।
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এ সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আয়োজন থাকলেও দূরবর্তী ব্যবস্থায় স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। তবে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যেতে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময় গণনা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে শিগগিরই বৈঠক হতে পারে।
তবে ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিরোধীরা বলছেন, চুক্তিটি ইরানের ওপর চাপ কমিয়ে দিয়েছে, অথচ দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি চুক্তিটিকে কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার অভিযোগ, এতে ইরান বুঝে গেছে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তির শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো আর্থিক সুবিধা বা নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে না। তিনি জানান, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহায়তা বন্ধ করার বিষয়েও ইরানকে প্রমাণ দিতে হবে।
চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ইসরায়েলের উচিত বাস্তবতা উপলব্ধি করে শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানো।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। লেবাননে সাম্প্রতিক এক হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের বাইরে একটি পৃথক বিষয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও চুক্তির কয়েকটি শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভ্যান্স বলেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়া সফল করতে হলে আঞ্চলিক পক্ষগুলোকেও সংযম দেখাতে হবে। বিশেষ করে বৈরুতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পূর্বের পোস্ট :