যুক্তরাজ্যে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের নেতৃত্বাধীন কথিত সংঘবদ্ধ যৌন নিপীড়ন চক্রের ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির সংসদ সদস্য রুপার্ট লো প্রকাশিত ২১৮ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে কয়েক দশক ধরে চলা যৌন সহিংসতার বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। এর জেরে শিশু ও কিশোরীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে।

রাশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আরটি ইন্টারন্যাশনাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুপার্ট লোর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাজ্যের ১৪৯টি স্থানীয় প্রশাসনিক এলাকায় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের নেতৃত্বাধীন সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে মূলত শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কিশোরী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত ভুক্তভোগীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেখানে গত এক দশকে আড়াই লাখের বেশি নারী ও শিশু এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, ইয়াহু নিউজের একটি স্বাধীন তথ্য যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়। ২০২২ সালের একটি স্বাধীন তদন্তেও বলা হয়েছিল, সংঘবদ্ধ শিশু যৌন নিপীড়নের প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।

রুপার্ট লোর প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বারবার ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরে এলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে ছয় লাখ পাউন্ড ব্যয়ে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে শত শত ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সংগৃহীত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রায় অর্ধেক স্থানীয় প্রশাসনিক এলাকায় এ ধরনের চক্র সক্রিয় ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুবিধাবঞ্চিত বা পারিবারিক সমস্যায় থাকা কিশোরীদের প্রথমে অর্থ, উপহার বা মাদকের মাধ্যমে প্রলুব্ধ করা হতো। পরে তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে যৌন নির্যাতনের শিকার বানানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক শহর থেকে অন্য শহরে তাদের নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে, এসব অপরাধ মোকাবেলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আগের বিভিন্ন তদন্তে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, বর্ণবাদ বা ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় তারা অনেক সময় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।

প্রতিবেদনে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারেরও সমালোচনা করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সরকারি কৌঁসুলি বিভাগের প্রধান থাকাকালে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারতেন। তবে তার সমর্থকরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

চলতি বছরের শুরুতে ব্রিটিশ সরকার এ বিষয়ে নতুন তদন্ত কার্যক্রম শুরু করলেও রুপার্ট লোর প্রতিবেদনে সেটিকে যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, অপরাধের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

এদিকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে অর্থায়ন করতে তিনি প্রস্তুত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাজ্যে শিশু সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ, অভিবাসন এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘবদ্ধ অপরাধের দায় কোনো একটি জাতিগত বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।