বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজিত হওয়ার পর এবার ভাঙনের মুখে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভায় বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে দলটির একাংশ নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
সোমবার জি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়া তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ককে কলকাতার কালীঘাটের বাসভবনে বৈঠকে ডাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ওই বৈঠকে ৬১ জন বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকেই দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয় ‘নয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ গঠনের উদ্যোগ। দল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নতুন এই রাজনৈতিক শিবির গড়ে উঠছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, নতুন শিবিরে ইতোমধ্যে অন্তত ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক যুক্ত হয়েছেন।
রাজ্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংকটের সূত্রপাত ঘটে বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে স্পিকারের কাছে একটি চিঠি জমা দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহার নাম, স্বাক্ষর ও হাতের লেখা জাল করে সমর্থন দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ অভিযোগের পর রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সংবাদ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ঋতব্রত ও সন্দীপন সাহার অভিযোগের ভিত্তিতে হেয়ার স্ট্রিট থানায় বিধানসভার সচিবালয় অভিযোগ দায়ের করেছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্তে অপরাধ তদন্ত বিভাগকে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের পরপরই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। বহিষ্কারের পর ঋতব্রত বলেন, তৃণমূল সরকারের আমলে বহু দুর্নীতি হয়েছে এবং এ বিষয়ে তার কাছে নানা তথ্য রয়েছে।
তিনি নতুন বিজেপি সরকারের কাছে এসব অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান। তবে বিধায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করবেন না বলেও স্পষ্ট করেন।
অন্যদিকে সন্দীপন সাহা বলেন, “নৈতিকতার কারণে যদি আমাকে বহিষ্কার করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি খুশি। অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধেই আমি অভিযোগ করেছি। মানুষ অচিরেই তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করবে।”
দলটির সংকট আরও গভীর হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের পদত্যাগের ঘটনায়। রোববার চন্দননগর পৌরসভার ৩০ জন তৃণমূল কাউন্সিলর একযোগে পদত্যাগ করেন। এর আগে পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান মুন্না আগরওয়ালও পদত্যাগ করেছিলেন। ফলে প্রশাসনকে পৌর বোর্ড ভেঙে দিতে হয়েছে।
এর আগে কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী পুরসভার জনহিসাব কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্বও ছেড়ে দেন। তার সঙ্গে পদত্যাগ করেন সাবেক রাজ্যসভার সদস্য শান্তনু সেনও।
এদিকে কলকাতা পুরসভার ৮১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জুঁই বিশ্বাস ও দলের মুখপাত্র বিশ্বজিৎ দেবও প্রকাশ্যে দলের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। তারা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করেন।
তৃণমূলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন বারাসতের বিধায়ক কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি দলের আরেক বিধায়ক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মৌখিক হেনস্তার অভিযোগ তুলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, বহিষ্কার, পদত্যাগ এবং নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ গঠনের উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পূর্বের পোস্ট :