বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে আকাশপথের যাত্রায় যোগ হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। পর্যটকদের দীর্ঘদিনের চেনা বিমানবন্দরটি এবার পা রাখছে আরও আধুনিক এক পর্বে। 

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) থেকে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ভবন থেকেই শুরু হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীসেবা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরের নির্দেশনার পর নতুন টার্মিনালে কার্যক্রম স্থানান্তরের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক মো. গোলাম মোর্তোজা হোসেন বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও এয়ারলাইনসকে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন টার্মিনালে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রাসহ অন্যান্য এয়ারলাইনসকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নতুন ভবনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হওয়ায় বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে এয়ারলাইনগুলো। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন ভবনে আধুনিক বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রী ও এয়ারলাইনগুলো কক্সবাজার বিমানবন্দর আধুনিকায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা ও প্রকল্প রয়েছে এবং কক্সবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। তাই একজন অপারেটর হিসেবে নতুন ভবন থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সরকারি সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন।

তবে নতুন টার্মিনালের কিছু ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, নতুন ভবন থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং বিষয়টি এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, চেক-ইন কাউন্টার ভাগাভাগি করে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রাকে একই চেক-ইন কাউন্টার ব্যবহার করতে হবে। এটিকে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে মনে করেন।

বিষয়টি নিয়ে বিমানবন্দর পরিচালক মোর্তোজা হোসেন বলেন, এতে আসলে কোনো সমস্যা হবে না। নতুন টার্মিনালে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার রয়েছে। কোনো এয়ারলাইন চাইলে আলাদা চেক-ইন কাউন্টারও ব্যবহার করতে পারবে।

নতুন ভবন চালুর প্রস্তুতি সম্পর্কে তাঁর সরল উত্তর, “প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ। সবকিছু ঠিকঠাক আছে।”

তবে কক্সবাজার বিমানবন্দরের এই পরিবর্তনের গল্প শুধু একটি নতুন টার্মিনাল ভবনের গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে সমুদ্রের বুক থেকে জমি তুলে রানওয়ে বাড়ানোর এক বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ।

২০১৮ সালে নেওয়া সরকারি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় শুরু হওয়া বিমানবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং এর পর্যটনশিল্পকে আরও গতিশীল করা।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো সমুদ্রের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণ। প্রকল্পের আওতায় সমুদ্র থেকে প্রায় ১,৭০০ ফুট অংশ পুনরুদ্ধার করে রানওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট—যা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের চেয়েও দীর্ঘ।

সরকারের অনুমোদনের পর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৫৬৮ কোটি থেকে ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।

সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই রানওয়েটিই কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম ভিত্তি। এর ফলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, বোয়িং ৭৪৭-৪০০সহ বড় আকারের ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং এয়ারবাসের বিভিন্ন মডেল সহজে ওঠানামা করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নতুন বড় টার্মিনাল ভবন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী আধুনিক অবকাঠামো নিয়ে তৈরি এই টার্মিনালই এখন প্রথমবারের মতো অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য খুলে যাচ্ছে।

অর্থাৎ সোমবার কক্সবাজারের আকাশে উড়বে আগের মতোই দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। কিন্তু যাত্রীদের যাত্রা শুরু হবে নতুন ঠিকানা থেকে—একটি এমন টার্মিনাল থেকে, যার নকশা ও অবকাঠামোর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক আকাশপথে কক্সবাজারকে যুক্ত করার বৃহত্তর স্বপ্ন।

নতুন টার্মিনাল থেকে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন এখন আর কেবল অবকাঠামোর নির্মাণকাজে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কক্সবাজার বিমানবন্দর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের দিকে।