তিন দিন কোমায় থাকার পর মারা গেছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) শিক্ষক জাকিয়া সুলতানা জুথি।
৩৬ বছর বয়সী জুথি সিভাসুর ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সহকর্মীরা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বান্দরবানে গিয়েছিলেন জুথি। সেখান থেকে ফেরার পর দুদিন জ্বরে ভোগেন। পরে খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনকেফেলাইটিস’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক জানান, এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের যেসব উপসর্গ দেখা যায়, জুথির ক্ষেত্রেও সেসব লক্ষণ ছিল।
চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যেহেতু অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা জুথি দুই সপ্তাহ আগে বান্দরবানে গিয়েছিলেন, তাই তিনি মশাবাহিত কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। সেটি ম্যালেরিয়া নাকি জাপানিজ এনকেফেলাইটিস, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক জুথির ম্যালেরিয়া পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছিল।
জুথির সহকর্মী ও সিভাসুর অধ্যাপক শিরিন আকতার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শনিবার রাতে জুথির জ্বর আসে। রোববার জ্বরের সঙ্গে পাতলা পায়খানা ও বমি হয়। রাত ১২টার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে সে নিজেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়।
“চমেকে সিট না পেয়ে তাকে ফ্লোরে রাখা হয়। পরে সেখানে থাকা সম্ভব না হওয়ায় রাত ২টার দিকে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সোমবার ভোরে তার প্রচণ্ড খিঁচুনি হয়। তখন হাত-পা বাঁকা হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।”
তিনি বলেন, শুরুতে চিকিৎসকেরা ম্যালেরিয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু এমআরআই করার পর দেখা যায়, জুথির মস্তিষ্কে ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ও মস্তিষ্কের ক্ষতির ধরন দেখে চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, তিনি জাপানিজ এনকেফেলাইটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
শিরিন আকতার বলেন, “সোমবার তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। একপর্যায়ে হার্ট অ্যাটাক হয় এবং সে কোমায় চলে যায়। পরে সোমবার সন্ধ্যায় তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শুরুতে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থায় কিছুটা সাড়া দিলেও পরে আর কোনো সাড়া দিচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার ভোরে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসক ডা. কাওসারুল আলম বলেন, “তার জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট ছিল। এমআরআই রিপোর্টে মস্তিষ্কে পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। তার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিল।
“দুইজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও মত দিয়েছেন, লক্ষণ অনুযায়ী তিনি জাপানিজ এনকেফেলাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দ্রুত অবস্থার অবনতি ও মস্তিষ্কে যে ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা এ ভাইরাসের সংক্রমণের দিকেই ইঙ্গিত করে।”
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তার বান্দরবান ভ্রমণের ইতিহাস আছে। তাই মেট্রোপলিটন হাসপাতালের কাছ থেকে সব পরীক্ষার রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। ম্যালেরিয়া কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “জাপানিজ এনকেফেলাইটিসও মশাবাহিত ভাইরাস। সেটিও হয়ে থাকতে পারে। নিশ্চিত না হয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।”
বৃহস্পতিবার জাকিয়া সুলতানা জুথির মরদেহ শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহে নেওয়া হয়। রাতেই সেখানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
জাকিয়া সুলতানা জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর স্বামী অধ্যাপক শাহরিয়ার হাসেম অর্ণব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।
জুথির আকস্মিক মৃত্যুতে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সিভাসুর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান।
পূর্বের পোস্ট :