দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলার কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে পানি পাওয়ায় স্বস্তিতে আছেন কৃষকরা। এতে উৎপাদন বৃদ্ধিরও প্রত্যাশা করছেন তারা।
চলমান বোরো মৌসুমে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দেশের অনেক স্থানে সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এই সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।
তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় উত্তরের চার জেলার প্রায় ১০ লাখ কৃষক কোনো ধরনের বাড়তি ভোগান্তি ছাড়াই বোরো আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। ডিজেল ও বিদ্যুচ্চালিত সেচের তুলনায় সাশ্রয়ী ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হওয়ায় প্রতি বছরই এ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে আবাদি জমির সংখ্যা। যদি তিস্তা খনন করে এই খালগুলোর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয় তবে কৃষকরা সুবিধা পাবেন, আর উৎপাদনও কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রংপুর পাউবোর উপপ্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৫-২৬) বোরো মৌসুমে উত্তরের চার জেলার মোট ১২ উপজেলার ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় এসেছে। প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী জেলার পাঁচটি উপজেলায় (সদর, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর) ৩২ হাজার হেক্টর, দিনাজপুর জেলার তিনটি উপজেলায় (খানসামা, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর) ৬ হাজার হেক্টর, বগুড়ায় ২৩ হাজার হেক্টর এবং রংপুর জেলার চারটি উপজেলায় (সদর, গংগাচড়া, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ) ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। তিস্তা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন খালের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, গঙ্গাচড়া উপজেলার সয়রা বাড়ি ও বাকপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার খালের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি এনে প্রায় ১৩০ একর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নদীতে ৮ থেকে ৯ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে, গত বছরের এ সময়ে যা ছিল মাত্র ৩ হাজার কিউসেক।
তিস্তা প্রকল্পের সেচব্যবস্থায় সন্তুষ্ট স্থানীয় কৃষকরা। এ বিষয়ে গংগাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, অন্য উৎস থেকে এক একর জমিতে সেচ দিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় সেচ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এক একর জমিতে ৮৫ থেকে ৯০ মণ ফলনের আশা করছেন।
কৃষকদের মতে, তিস্তার পানিতে থাকা পলি মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের পানি ব্যবস্থাপনা দলের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বলেন, তিস্তার পানিতে পলি থাকায় জমিতে একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা দীর্ঘক্ষণ পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার অনেক কমে আসে। ফলে অন্য সেচ ব্যবস্থার তুলনায় এখানে বিঘাপ্রতি তিন-চার মণ ফলন বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, তিস্তা প্রকল্পের সুবিধার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাকপুর পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মালেক জানান, ফেব্রুয়ারির আগে পানি না পাওয়ায় অনেককে বীজতলা তৈরির সময় বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হয়েছে। এছাড়া কাঁচা খালে ইঁদুরের গর্ত এবং উঁচু-নিচু জমিতে পানি পৌঁছানোর সমস্যাও রয়েছে।
অপরদিকে, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কিছু খালের সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। জানুয়ারির শুরু থেকেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান সমস্যা দূর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পাউবো রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে। চৈত্র মাসে আগাম বৃষ্টির কারণে এবার নদীতে পানি বেশি, জলবায়ু পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা।’
সেচের সময় এগিয়ে আনার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধান, তামাক, ভুট্টাসহ ভিন্ন ভিন্ন ফসলের কারণে সেচের সময় সমন্বয় করতে হয়। কৃষকরা যদি একই ধরনের ফসল আবাদ করেন, তবে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব। বেশকিছু খালের সংস্কারকাজ চলায় এ বছর জমির পরিমাণ আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি, তবে আগামী দুই মাস এ সরবরাহ অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
পূর্বের পোস্ট :