জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে পুলিশ পরিচয়ে মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে ঢাকা থেকে ফেরার পথে নগরীর লালখান বাজার মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পরে গভীর রাতে নাঈম হাসানের বাবা, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা থানায় যান। এরপর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত হন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাঈম হাসান।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ক্রিকেটার ফেইসবুকে পোস্ট করেছেন।
শুক্রবার রাতে থানায় সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাঈম হাসান কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেন, “আজকে (শুক্রবার) প্রিমিয়ার লিগের খেলা চলছিল। খেলে আসার সময় আমার ফ্লাইট ডিলে হয়েছে। ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইট ১০টা ২০ মিনিটে ছাড়ে। এরপর আমি এয়ারপোর্টে নেমে সিএনজি নিই।
“রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে আমার সিএনজি থামানো হয়। আমি বের হয়ে দাঁড়াই। পরে আমাকে কিছু না বলে উনার (চালকের) গাড়ির কাগজপত্র নেয়। আমি বলি, ব্যাগ চেক করেন। তখন আমাকে বলে, ‘তুই গাড়িতে উঠ’। এরপর গলা চেপে ধরে আমাকে গাড়িতে তোলে।”
নাঈম বলেন, “আমি বলি, আমাকে গলা চেপে ধরে কেন তুলছেন? আমি ধাক্কা মেরে বের হয়ে যাই। এরপর আবার গলা চেপে ধরে ওদের গাড়িতে তোলে। আর ইচ্ছামতো হ্যারাসমেন্ট করছিল।
“পুলিশ ছিল দুইজন। আরেকজন সাদা পাঞ্জাবি পরা ছিল। সে কোনো পরিচয় দেয়নি। একটা পাইপ দিয়ে মারছিল। মোবাইলও কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। পরে আমি আব্বুকে কল দিই। শুধু ‘আব্বু, আব্বু’ করছিলাম। আমার গলা চেপে ধরে রাখছিল।”
ওই পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয় বলে জানান তিনি। নাঈম বলেন, “প্রায় এক থেকে দেড়শ মানুষ জড়ো হয়। তারা সবাই আমার পরিচয় দেয়। তারপরও আমাকে মারছিল। বলছিল, ‘তুই আসামি, তুই কথা বলবি না’। আমি পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি, কিন্তু কিছুই হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ব্যাগ ট্যাগ নেয়। পরে এখানে (থানায়) আনে। এসে বলে, ‘স্যার, আনছি’। আমি দাঁড়িয়ে আছি, ওসি আমাকে বলে, ‘চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল’। পরে উনার মোবাইলে কল আসে। এরপর আমাকে বলে, ‘বস তুমি’।”
নাঈম হাসানের অভিযোগ, “গাড়িতে ওঠানোর সময় ওই পুলিশ সদস্য ওসিকে ফোন দিয়ে বলে, তাকে এখানে নিয়ে আসছে। আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি। সবাই পরিচয় দিয়েছে।
“আজ পর্যন্ত পুলিশ-আর্মি আমাদের ডাকলে আমি পরিচয় দিই, তারা চেক করে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আমার গায়ে হাত দেবে কেন? গলা চেপে ধরে তুলবে কেন? পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে মেরেছে, আর সোর্স পাইপ দিয়ে মেরেছে।”
তিনি বলেন, “আমি সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই। এটা স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কিছু নয়। আজ আমার সঙ্গে হয়েছে, কাল অন্য কারও সঙ্গে হলে সে কার কাছে যাবে?
“আমার জন্য আজ মানুষ এসেছে। কিন্তু অন্য কারও জন্য কি আসবে? তখন ওই মানুষগুলোই ভুক্তভোগী হবে।”
নাঈম জানান, প্রথমে তার মোবাইল ফোনও রেখে দেওয়া হয়েছিল। পরে ফোন হাতে পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল ও পরিচালক ইসরাফিল খসরুকে কল দেন।
“তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর আমি হাসপাতালে গিয়ে রিপোর্ট এনেছি,” বলেন তিনি।
থানায় উপস্থিত হয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। যেই হোক, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স। পুলিশের ভাবমূর্তির সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।”
তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে জেনেছি, চোরাচালান-সংক্রান্ত কিছু তথ্যের ভিত্তিতে তারা সেখানে গিয়েছিল। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে ভুলত্রুটি পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, “মারধরের কোনো সুযোগ নেই। পুলিশকে নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। কেন তাকে আনা হয়েছে, সেটাও তদন্তে বের করা হবে। উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে না পারলে শাস্তি হবে।”
নাঈম হাসানের বাবা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুব আলম বলেন, “নাঈম খেলা শেষে ঢাকা থেকে ফিরছিল। লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে তাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন আটকায়।
“যে সিএনজিতে করে নাঈম ফিরছিল, সেই সিএনজিতেই তুলে তাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তখন স্থানীয় লোকজন তাদের ঘিরে ফেলে। পরে তারা নাঈমকে খুলশী থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ডিসি ও এসি এসেছিলেন। রাতে আমরা এজাহার দিয়েছি। তিনজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি।”
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ, ডিসি (উত্তর) আমিরুল ইসলাম, এসি (বায়েজিদ বোস্তামি) মো. মারেফুল করিম এবং খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুল ইসলামকে ফোন করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
পূর্বের পোস্ট :