মালদ্বীপে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৫ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। কর্মক্ষম বয়সে এত মানুষের মৃত্যু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মৃত ৪৫ জনের মধ্যে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আটজন। বাকি দুজন আত্মহত্যা করেছেন।

মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৫ জন মালদ্বীপে বৈধভাবে কাজ করতেন। অন্য ১০ জনের সেখানে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র ছিল না। তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করেছে।

মালদ্বীপে বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি অংশকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে সকাল ৮টায় কাজ শুরু করে রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানা গেছে। দীর্ঘ সময় শ্রম দেওয়ার পরও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে অনেকের।

কিছু প্রতিষ্ঠানে মাসিক আট থেকে নয় হাজার মালদ্বীভিয়ান রুফিয়া বেতনের সঙ্গে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও যুক্ত থাকে। তবে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং দেশে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠাতে গিয়ে অনেক প্রবাসী আর্থিক চাপে পড়েন।

কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ সীমিত হয়ে আসতে পারে। পাশাপাশি পরিবার থেকে দূরে থাকা, চাকরি হারানোর ভয় এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এসব বিষয় প্রবাসীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা জানতে আরও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জটিলতার কারণে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

প্রবাসীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োগকর্তাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি। কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে বয়স, পেশা, কর্মপরিবেশ, চিকিৎসার ইতিহাস ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ পর্যালোচনা করা দরকার। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কিংবা মানসিক চাপকে এসব মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে চিকিৎসাবিষয়ক তদন্ত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ জরুরি।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক এবং প্রবাসী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় হাজারো বাংলাদেশি বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করেন। তাঁদের উপার্জন দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখে। তবে সেই উপার্জনের পথে তাঁদের জীবন ও স্বাস্থ্য যেন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।