যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) বাতিলের প্রচেষ্টায় সুপ্রিম কোর্টে বড় ধাক্কা খাওয়ার পরও বিকল্প পথ খোঁজার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে আইনি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন সংবিধান সংশোধন ছাড়া সাধারণ কোনো আইনের মাধ্যমে এই নাগরিকত্ব কাঠামো পরিবর্তন করা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

মঙ্গলবার ৬-৩ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশ খারিজ করে দেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প ওই আদেশ জারি করেছিলেন। এতে বলা হয়েছিল, যেসব শিশুর বাবা-মা অস্থায়ী বৈধ মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন অথবা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাস করছেন, তাদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না।

ইতালির ফ্লোরেন্সে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের রবার্ট শুম্যান সেন্টারের প্রভাষক রেইনার বাউবক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় অপ্রত্যাশিত নয়, তবে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিকে বহাল রেখেছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আদালত সংবিধানের একটি স্পষ্ট ও আক্ষরিক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করায় সাধারণ আইনের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠদের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এটি পরিবর্তন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

একই মত দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসনবিষয়ক প্রভাষক নান্দো সিগোনা। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মতো কঠিন প্রক্রিয়ায় না গেলে কংগ্রেসের সাধারণ আইন পাসের যেকোনো উদ্যোগ আদালতে তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

রায়ে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প

সুপ্রিম কোর্টের রায়কে দেশের জন্য ‘খুবই খারাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি একই লক্ষ্য অর্জনে বিকল্প পথ অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছেন।

তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা সাধারণ আইন পাসের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা সীমিত করার চেষ্টা করতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমাদের দেশের জন্য ব্যয়বহুল এবং অন্যায্য এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বন্ধ করতে কংগ্রেসের আজ থেকেই কাজ শুরু করা উচিত। এ বিষয়ে তারা আমার পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমর্থন পাবে।”

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মামলাটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এপ্রিলের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টে মৌখিক শুনানিতেও উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্টে চলমান কোনো মামলার শুনানিতে উপস্থিত হওয়া তিনিই প্রথম দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্ট।

শুনানির মাঝপথে আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, “আমরাই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার মতো এত বড় বোকামি করছি।”

হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারও রায়কে ‘ধ্বংসাত্মক ও ন্যক্কারজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, “আমেরিকান নাগরিকত্ব বিশ্বের সবার জন্মগত অধিকার নয়। এটি কেবল আমেরিকানদের। আমাদের জাতিকে বিলীন করে সংবিধানের কোনো ধারা এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টে পরাজয়ের পরও ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের লড়াই চালিয়ে যাবে।

রায়ের সম্ভাব্য প্রভাব

বর্তমান মার্কিন আইনে বাবা-মায়ের অভিবাসন মর্যাদা যেমনই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়।

মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট ও পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মে ২০২৫ সালের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু নাগরিকত্বহীন অবস্থায় জন্ম নিত।

গবেষণায় আরও বলা হয়, ২০৪৫ সালের মধ্যে নথিপত্রহীন জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ বেড়ে যেত।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, এই নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ত লাতিনো অভিবাসীদের ওপর। ২০৫০ সালের মধ্যে বৈধ নথিপত্র ছাড়া জন্ম নেওয়া মানুষের ৯০ শতাংশেরও বেশি লাতিনো হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

অন্যদিকে, এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তুলনামূলকভাবে বড় বৃদ্ধি দেখা যেত। বৈধ নথিপত্রহীন প্রতি এক হাজার এশীয় অভিবাসীর বিপরীতে ৪১টি অননুমোদিত শিশুর জন্ম হতো, যেখানে লাতিনোদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল প্রতি হাজারে ১৭টি।

বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শুধু অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক।

সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুবিধাভোগীরা ১৯৭৫ থেকে ২০৭৪ সালের মধ্যে তাদের আয় ও উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রায় ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখবেন।