প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে জাহাজটি প্রণালি পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে যাত্রা করবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এসে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। প্রণালি অতিক্রম করতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইরানি নৌবাহিনীর অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, “বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এসে অপেক্ষা করছে। অনুমতি পেলে জাহাজটি প্রণালি পার হবে। জাহাজের ৩১ জন নাবিকের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তারা সবাই ভালো আছেন।”

জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সবাই সুস্থ আছি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এখনো পুরোপুরি চলাচলের জন্য প্রণালি খুলে দেয়নি। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ পার হতে পারবে না।”

বিএসসির মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পরদিন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে জাহাজটি পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়ে।

এরপর কয়েক দফা হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও অনুমতি না পাওয়ায় ফিরে আসতে হয় জাহাজটিকে। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন সার রয়েছে। প্রণালি পার হতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হবে এটি।

তবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, প্রণালি নিরাপদ করা, দ্বিতীয়ত প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া এবং তৃতীয়ত অপেক্ষমাণ জাহাজের চাপ কমানো।

তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অনেক জাহাজ পারস্য উপসাগরে অপেক্ষা করছে। নিরাপদভাবে চলাচলের জন্য আগে প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে।”

তার মতে, হরমুজ প্রণালির একটি অংশ হয়তো সীমিত আকারে খোলা হয়েছে, কিন্তু বড় আকারের জাহাজের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়। বড় জাহাজের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোর কারণে প্রণালিতে চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতেও সময় লাগবে।

তার ধারণা, পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হরমুজ প্রণালির ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এর আগে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও কয়েক দফা হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় প্রতিবারই ফিরে আসতে হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল এবং ১৭ এপ্রিল জাহাজটি প্রণালির দিকে রওনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা পার হতে পারেনি।

জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন নাবিকসহ হরমুজ প্রণালির আশপাশে অবস্থানরত কয়েকটি জাহাজে প্রায় একশ বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকায় তাদের মানসিক চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।