রংপুর শহরের শাপলা চত্বরে সকাল থেকেই জড়ো হন দিনমজুরেরা। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ আবার নির্মাণকাজের জোগালি। কাজের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও অনেকেই ফিরতে হয় খালি হাতে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষিশ্রমিক জাহিদুল ইসলামও তাঁদের একজন। কাজের অভাবে তিন বছর আগে রংপুর শহরে আসেন তিনি। কৃষিকাজের পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ ও টাইলস বসানোর কাজও শিখেছেন। তবু নিয়মিত কাজ পান না।

গত ২৭ এপ্রিল শাপলা চত্বরে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বাজারের ব্যাগে জামাকাপড় নিয়ে কাজের সন্ধানে এসেছিলেন তিনি।

আক্ষেপ করে জাহিদুল বলেন, “ভুঁই নিড়ানি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, হেলপারি—সব কাজই পারি। যেখানে নেয়, সেখানেই যাই। তাও একদিন কাজ পাই, আরেক দিন পাই না।”

ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ভারী শিল্প, পোশাক কারখানা কিংবা বড় উৎপাদনমুখী শিল্প গড়ে ওঠেনি রংপুর অঞ্চলে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিনির্ভর শিল্পের প্রসার না হওয়ায় জাহিদুলের মতো শ্রমিকেরা বছরের বড় সময় বেকার থাকেন।

সরকারি তথ্য বলছে, দেশের খাদ্য উৎপাদনে রংপুর বিভাগের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান, আলু ও ভুট্টা উৎপাদনে দেশের শীর্ষ অঞ্চলের একটি এটি। তবু দারিদ্র্য, নিম্ন আয় ও সীমিত শিল্পায়নের কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে বিভাগটি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে প্রতি পাঁচজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও রংপুরে তা ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

খাদ্য উৎপাদনে শীর্ষে, শিল্পে পিছিয়ে

কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশের মোট কৃষি উৎপাদনের ২২ থেকে ২৫ শতাংশ আসে রংপুর বিভাগ থেকে। দেশের সবচেয়ে বেশি নিট আবাদি জমিও এ বিভাগে। বছরে একাধিকবার চাষাবাদ হওয়ায় শস্যের নিবিড়তাও সর্বোচ্চ।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ এসেছে রংপুর বিভাগ থেকে। আলু উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশও আসে এ অঞ্চলের আট জেলা থেকে। ভুট্টা উৎপাদনেও দেশের শীর্ষে রংপুর।

এ ছাড়া হাঁড়িভাঙা আম, দিনাজপুরের লিচু ও সমতলের চা নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক মনে করেন, রংপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার বড় সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, “এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। একই সঙ্গে এখানে কম মূল্যে শ্রম পাওয়া যায়। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছানো সম্ভব।”

শিল্পায়নের অভাব, বাড়ছে ঢাকামুখিতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুরে শিল্পায়নের অভাবই দারিদ্র্যের বড় কারণ। কৃষিকাজ মৌসুমি হওয়ায় বছরের একটি বড় সময় শ্রমিকদের কাজ থাকে না। ফলে আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, “রংপুরে শিল্পায়ন না হওয়ায় গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ রাজধানীসহ অন্য শহরে গিয়ে পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। এই প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে।”

২০০৮ সালে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন নিয়ে গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, দেশে মোট শিল্প ইউনিটের মাত্র ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ ছিল রংপুর বিভাগের আট জেলায়। বর্তমানেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।

অর্থনীতি শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, জাতীয় অর্থনৈতিক ইউনিটের মাত্র ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ রংপুর বিভাগে। সেখানে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।

গ্যাস-সংকট ও বিনিয়োগবৈষম্য

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস–সংযোগ না থাকায় বড় শিল্প গড়ে ওঠা কঠিন। পাশাপাশি স্বল্প সুদের ঋণ ও বিনিয়োগেও বৈষম্যের শিকার রংপুর।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক পার্থ বোস বলেন, “গ্যাস ছাড়া বড় শিল্প টিকবে না। এ ছাড়া সহজ শর্তে ঋণও পাওয়া যায় না। রংপুরের জন্য কর–সুবিধাসহ বিশেষ প্রণোদনা দিলে শিল্পকারখানা বাড়বে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, আলু, ভুট্টা ও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, হিমাগার ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে রংপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের বড় সুযোগ রয়েছে।

নতুন আশার আলো

সম্প্রতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া কুড়িগ্রামে ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, কাউনিয়ায় প্রায় ৪২৮ একর জমিতে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ শ্যামপুর চিনিকলকে অন্য শিল্পে রূপান্তরের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কাজের খোঁজে রংপুর ছাড়তে হতে পারে আরও অনেককে।

শাপলা চত্বরে অপেক্ষমাণ নির্মাণশ্রমিক সুমন মিয়া বলেন, “দুই দিন ধরে কাজ পাচ্ছি না। এমন চললে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় চলে যেতে হবে।”