নয় মাস বয়সী নূর এপ্রিলের শুরু থেকে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। ৮ এপ্রিল চাঁদপুরের এই শিশুকে ভর্তি করা হয় ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিতে হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউতে)।
বর্তমানে শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন তার মা সুমাইয়া। গত এক মাসে ওষুধ, আইসিইউ ও আনুষঙ্গিক খাতে ৮০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নূরের বাবা নুরুল্লাহ হাসান।
শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি বলেন, “আমার একটি ওষুধের দোকান আছে। মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করি। কিন্তু হঠাৎ করে বাচ্চার পেছনে এত টাকা খরচ হচ্ছে। আবার হাসপাতালে সময় দিতে গিয়ে দোকানও বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “প্রায় তিন মাসের আয়ের টাকা একবারেই খরচ হয়ে গেছে। আর কয়েক দিন থাকলে এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।”
নূরের মা সুমাইয়া বলেন, হাসপাতালে আসার পর থেকেই প্রতিদিন অনেক খরচ হচ্ছে।
“এখান থেকে কিছুই পাওয়া যায় না। ডাক্তার-নার্স যা আনতে বলেন, সব বাইরে থেকে কিনতে হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধ মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আইসিইউতে রাখার সময় অ্যান্টিবায়োটিক, বিভিন্ন ইনজেকশন কিনতে বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে।”
চিকিৎসা ব্যয়ে দিশেহারা পরিবার
শিশু হাসপাতালের আরও কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
অভিভাবকদের ভাষ্য, সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে মাকে থাকতে হচ্ছে, বাইরে থেকে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে অবস্থান করায় আয় কমে যাচ্ছে, বাড়ছে খরচ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে ৬ হাজার ৯৭৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৬১ জন। সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪৭ হাজার ৬৫৬। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৯১ জনের।
বরিশাল থেকে শিশু আলিফকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন জুয়েল-তন্বী দম্পতি। বরিশালে তিন দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে তারা রাজধানীতে আসেন।
জুয়েল বেপারী বলেন, “আমি গাড়িচালক ছিলাম। বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগেই চাকরি চলে গেছে। এখন ধারদেনা করে চিকিৎসা করাচ্ছি।”
তিনি বলেন, “ঢাকায় এসে কোনো হাসপাতালে বেড পাইনি। পরে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় বসেছিলাম। বেড খালি হলে ভর্তি করাতে পেরেছি।”
জুয়েল জানান, সরকারি হাসপাতালেও সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
“বরিশাল ও ঢাকায় মিলিয়ে এক সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চলছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন পারব বুঝতেছি না।”
‘সেবা ছাড়া কিছুই মিলছে না’
বিভিন্ন হাসপাতালের অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরামর্শ ছাড়া প্রায় সবকিছুই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট, স্যালাইন, ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক—সবই বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ভোলার খলিল মিয়া মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। চিকিৎসা করাতে এসে কাজকর্ম বন্ধ। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।”
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, “ফ্রি বেডের রোগীরা খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনামূল্যে পেয়ে থাকে। তবে পেইং বেডের রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ আনতে হয়।”
ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “সব রোগীরই এটি পাওয়ার কথা। কেন পাচ্ছে না, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।”
বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় কয়েকগুণ বেশি
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে অল্প সময়ের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করালেও বিপুল খরচ গুনতে হচ্ছে।
জুয়েল বেপারী বলেন, “শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে দেড় ঘণ্টা রাখতেই ১৩ হাজার টাকা বিল হয়েছিল।”
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি জানান, নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) শয্যা ভাড়া দৈনিক ৬ হাজার টাকা। এর বাইরে ওষুধপত্র আলাদা।
শিশু হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালে একদিন আইসিইউতে রাখলে ২৫ হাজার টাকার বেশি বিল আসে। তাই সবাই সরকারি হাসপাতালে আসছেন।”
শয্যা ও আইসিইউ সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আগে হাম রোগীদের জন্য ৪৬টি শয্যা ছিল। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৭৪ করা হয়েছে। কিন্তু ভর্তি রোগী প্রায় ৯০ জন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য ৯০টি শয্যা থাকলেও শনিবার পর্যন্ত ভর্তি ছিল ৯৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬২০টি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “রাজশাহী ও শিশু হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কোথাও ওষুধের ঘাটতি থাকলে রিকুইজিশনের মাধ্যমে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।”
থামছে না মৃত্যু
শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯ শিশু।
১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মোট ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঢাকা বিভাগে, ১৭৩ জন। রাজশাহীতে মারা গেছে ৮০ শিশু।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, “হামের সরাসরি কোনো প্রতিষেধক নেই। জটিলতা ঠেকাতে বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনেক শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় আনা হচ্ছে, তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাঁচানো যাচ্ছে না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি না করে খণ্ড খণ্ডভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।”
পূর্বের পোস্ট :