হাওরাঞ্চলে এ বছর বড় ধরনের বাঁধভাঙন হয়নি। তবু বোরো ধান তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। কৃষকেরা বলছেন, এবার ফসলহানির জন্য দায়ী ফসলরক্ষা বাঁধই। পানি উন্নয়ন বোর্ডও (পাউবো) বলছে, হাওরে ‘যত্রতত্র উন্নয়ন’ জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।
কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, গত এক দশকে প্রয়োজন–অপ্রয়োজনে হাওরের নানা স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষার পানি নামার স্বাভাবিক রাস্তা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তলিয়ে যাচ্ছে ফসল।
হাওরের তীরবর্তী উঁচু জমি, যাকে স্থানীয়ভাবে ‘জাঙ্গাল’ বলা হয়, সেখান থেকে মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করা হয়। বর্ষায় সেই মাটি ধুয়ে খাল–নদীতে জমে পানির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে উজান থেকে নামা ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ পাচ্ছে না।
মৌসুমের শুরুর দিকে অনেক হাওরে কৃষকেরা শত শত পাম্প বসিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু টানা ভারী বৃষ্টিতে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অনেকেই এবারের পরিস্থিতিকে ‘নয়া দুর্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়দের ভাষায়, কয়েক বছর পরপর এমন অতিবৃষ্টি হয়, যাকে তারা ‘কাঁচইরা বছর’ বলেন। ফাল্গুন থেকেই এ বছর বৃষ্টি শুরু হয়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে নিচু এলাকার কাঁচা ফসল ডুবে যায়। এরপর এপ্রিলের শেষ দিকে টানা বর্ষণে প্রায় সব হাওরের ফসল তলিয়ে যায়।
বাঁধ থেকে বিপদের রূপান্তর
২০১৭ সালের বড় ক্ষতির পর কৃষকদের দাবিতে ২০১৮ সাল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যবস্থার সুযোগে অপরিকল্পিতভাবে অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সুনামগঞ্জে ৭১৮টি প্রকল্পে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১ লাখ ২১ হাজার ঘনমিটার মাটি কাটা হয়েছে। গত তিন বছরে দুই হাজার ১৩৬টি প্রকল্পে মোট ৯৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৮ ঘনমিটার মাটি ব্যবহার হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ মাটি কাটার ফলে হাওরের জাঙ্গাল, গাছপালা ও জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে সেই মাটি খাল–নদী ভরাট করে জলাবদ্ধতা আরও বাড়াচ্ছে।
তাহিরপুরের পাটাবুকা গ্রামের কৃষক রিপচান হাবিব বলেন, “প্রতিযোগিতা করে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। এতে হাওরের পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”
হাওরের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা গবেষক সজল কান্তি সরকার বলেন, “অতিরিক্ত বাঁধ ও তার মাটি হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। জলাশয় ভরাট হয়ে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে।”
বৃষ্টিপাত বেড়েছে, সংকট তীব্র
পাউবোর পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর বৃষ্টিপাত গত বছরের তুলনায় বেশি। এপ্রিলের শেষ দিকে টানা ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জে প্রায় ১৫ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি
গবেষক আব্দুল হাই চৌধুরীর মতে, হাওরের আগাম বন্যা কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়; এর পেছনে নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, “অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের মাটি হাওরে জমে পানি ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় সংকট তৈরি করছে।”
সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, “হাওরে যত্রতত্র উন্নয়ন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।”
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। “নদী, খাল ও জলাশয় খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে। হাওরের প্রকৃতি বুঝে পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও বাড়বে।”
পূর্বের পোস্ট :