২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সরকার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, সমুদ্র অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছে এবং অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে।
রবিবার (২৬ জুলাই) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘রোডম্যাপ ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি-২০২৬: দ্য ক্যাপিটাল ডায়ালগ’ শীর্ষক এক রুদ্ধদ্বার গোলটেবিল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছে, তারা কীভাবে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে পারে। এটি একটি চলমান আলোচনা। অনেক বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তাদের সঙ্গে কাজ করছে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কাজ করছে।’
তিনি বলেন, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এর আগে, গত ১৩ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ‘ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা এবং বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী, স্টেকহোল্ডার ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ওই সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় আজকের রুদ্ধদ্বার গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অর্থ উপদেষ্টা, বিনিয়োগকারী, পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
তিনি আরও বলেন, এখানে মূলত আলোচনা হয়েছে, আমাদের কী কী সমস্যাগুলো আছে; আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে বিলম্ব (ডেফারমেন্ট), আমাদের পুঁজিবাজার, বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ, এখানে সহজে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিভিন্নভাবে যে ধরনের সমস্যা এখানে মোকাবিলা করতে হয়, সেগুলোর সমাধানে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিতে পারি—এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, বিভিন্ন সমস্যা, আলোচনা ও পরামর্শগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করে সমাধানের দিকে এগোনো হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার ও বিভিন্ন ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে একটি গতিশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণ করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের সৃজনশীল অর্থনীতি, বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোনে যখন বিনিয়োগ হবে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কী কী ধরনের সুবিধা প্রয়োজন, কী কী ধরনের প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন আমাদের আনতে হবে যাতে তারা সহজেই বিনিয়োগ করতে পারেন, সেইসব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিনিয়োগের অগ্রাধিকার খাত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জ্বালানি, টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে আমরা যখন ক্রিয়েটিভ ইকোনমির (সৃজনশীল অর্থনীতি) কথা বলছি, সেখানে আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আমাদের কুটির শিল্প, আমাদের কৃষ্টি, কালচার—এখানেও কিন্তু অর্থনৈতিক বিনিয়োগের একটা বিশাল সুযোগ আমরা তৈরি করার চেষ্টা করছি।’
ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতেও বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য ক্রীড়া কূটনীতি ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যে স্বপ্ন যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশের আপামর জনতা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, আমাদের নারী সমাজ—প্রত্যেকেই এই অগ্রগতি, এই উন্নয়নের অংশ হবে, সেটি বাস্তবায়ন করাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ।
ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতিতে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত।
এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘অবশ্যই, অবশ্যই! ব্লু ইকোনমি নিয়ে কথা হয়েছে, ব্লু ইকোনমি তো ওয়ান অব দ্য প্রায়োরিটিজ (অন্যতম অগ্রাধিকার)। ব্লু ইকোনমিতে আমরা ইনভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ) চাই; বিভিন্ন ইউরোপিয়ান কান্ট্রিগুলো আমাদের ব্লু ইকোনমিতে ইনভেস্ট করতে চাচ্ছে এবং সেটার অনেক সুযোগও আছে বাংলাদেশে। তো সেগুলো নিয়েও আমাদের কথা হচ্ছে।’
তিনি জানান, বিনিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য এ ধরনের রাউন্ড টেবিল বৈঠক আরও আয়োজন করা হবে।
আগামী ছয় মাস বা এক বছরে কত বিনিয়োগ আসতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, বিনিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া; এর জন্য নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করা যায় না।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ প্রক্রিয়া তো ইতোমধ্যে চলছে। অনেক দেশ এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে যে তারা বিভিন্ন খাতে কীভাবে বিনিয়োগ করতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী বিডার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তাদের সঙ্গে কাজ করছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশই কিন্তু বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত আছে। তারা বিনিয়োগের ব্যাপারে কথাবার্তা চালাচ্ছে।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের অর্থমন্ত্রী যখন বাজেট দিয়েছেন, উনি কিন্তু বলেছেন যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের একটা অর্থনীতি আমরা অর্জন করতে চাই; সেটি আমাদের লক্ষ্য। সেই অর্থনীতি বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের যে ধরনের বিনিয়োগ দরকার, সেই ধরনের বিনিয়োগ আমরা আনার চেষ্টা করছি। সেই কাজ চলছে।