ব্রাসেলস, ৩০ সেপ্টেম্বর - জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ ও দাবানলের সঙ্গে যানবাহন, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট নিঃসরণ মিলে চলতি বছর বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অত্যন্ত উচ্চমাত্রার ওজোন দূষণের সংস্পর্শে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের বায়ুমানের ওপর নতুন এক বিশ্লেষণে ইইউর কোপার্নিকাস ক্লাইমেট অ্যাটমস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস (সিএএমএস) জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছে।

তীব্র তাপ ও সূর্যের আলো যখন দাবানল, যানবাহন ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন ভূমির কাছাকাছি স্তরে ওজোন তৈরি হয়। এই দূষণ ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করতে পারে, হাঁপানির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গত কয়েক দশকে ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী পদার্থের নিঃসরণ কমাতে অগ্রগতি হলেও ওজোন দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ওজোন তৈরির অনুকূল পরিবেশ আরও বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ দাবানল ওজোন দূষণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এসব দাবানলের ধোঁয়া নিজ নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইন্দোনেশিয়াতেও বড় ধরনের দাবানল দেখা গেছে। এ ছাড়া জুনে শুরু হওয়া এবং চলতি বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকা উষ্ণ এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও দাবানলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিএএমএসের পরিচালক লরেন্স রুইল বলেন, ‘বায়ুদূষণ কোনো সীমান্ত মানে না। এটি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, মহাদেশ ও মহাসাগর পেরিয়ে উৎসস্থল থেকে অনেক দূরের এলাকার বায়ুর মানকেও প্রভাবিত করতে পারে।’

‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুর সংস্পর্শে ৩৪ শতাংশ মানুষ

স্যাটেলাইট তথ্য ও কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে বায়ুদূষণ ও দাবানল পর্যবেক্ষণ করে সিএএমএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ৩৪ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুমানের সংস্পর্শে ছিল। অর্থাৎ, এসব এলাকায় ওজোনের ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ওজোনকে আট ঘণ্টার গড় হিসাবে সর্বোচ্চ সুপারিশকৃত মাত্রা ধরা হয়।

এ ছাড়া বিশ্বের আরও ১৭ শতাংশ মানুষ ‘খুব খারাপ’ বায়ুর সংস্পর্শে ছিল। মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ ‘ভালো’ মাত্রার ওজোনযুক্ত বাতাস পেয়েছে।

এশিয়ায় দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি

ওজোন দূষণের সংস্পর্শে আসার হার এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি। মহাদেশটির ৫৩ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ মাত্রার ওজোন দূষণের মধ্যে ছিল। আরও ২২ শতাংশ মানুষ ছিল ‘খুব খারাপ’ মাত্রার দূষণের মধ্যে।

এশিয়ায় শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পরিবহন খাতের ব্যাপক নিঃসরণ এর অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাবানল এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া।

নয়াদিল্লি, ঢাকা, চীনের বৃহৎ নগরী চংকিং এবং পাকিস্তানের লাহোর—এসব শহরের ওজোনের মাত্রা ‘অত্যন্ত খারাপ’ পর্যায়ে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তর আমেরিকার দুই-তৃতীয়াংশ এবং ইউরোপের ৪৫ শতাংশ মানুষ ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বায়ুমানের সংস্পর্শে ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণকারী পদার্থের নিঃসরণ কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন বিধিমালা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে ওজোন দূষণ কমানোর ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি।

ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার কর্মকর্তা ইয়ান মারনান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ইউরোপে ওজোন দূষণের কারণে বছরে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

উত্তর আমেরিকাতেও উচ্চাভিলাষী নিঃসরণ কমানোর নীতি গ্রহণ করা হলেও ওজোনের মাত্রা ‘তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত’ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আফ্রিকায় দাবানল ও ধোঁয়ার প্রভাব

আফ্রিকায় বনভূমির আগুন, কৃষিজমি পোড়ানো এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। এ ছাড়া সাহারা মরুভূমির ধুলা ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

চলতি বছর আফ্রিকার ৮ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুমানের মধ্যে ছিল। আরও ১৯ শতাংশ মানুষের জন্য বায়ুর মান ছিল ‘খুব খারাপ’ বা ‘খারাপ’।

দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে ওজোনের মাত্রা ছিল খুব বেশি। রিও ডি জেনেইরোতে তা ছিল অত্যন্ত বেশি। তবে মহাদেশটির ৮১ শতাংশ মানুষের জন্য বায়ুর মান ছিল ‘ভালো’ বা ‘মোটামুটি ভালো’।

তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি ছিল ওশেনিয়া অঞ্চলে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ এ অঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ ‘ভালো’ মাত্রার ওজোনযুক্ত বাতাসে ছিল এবং ৩৪ শতাংশ মানুষ ছিল ‘মোটামুটি ভালো’ অবস্থায়।