বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে বন্যার কবলে পড়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা, সিলেট বিভাগের কয়েকটি এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পানি দ্রুত বাড়ছে। আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে অন্তত ১২ জেলায় বন্যা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা। পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, হাজারো পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সেনাবাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা মাঠে কাজ করছে।
কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। অনেক এলাকায় কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং স্থানীয় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। অনেক পরিবার বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের সংকটে পড়েছে। বন্যার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম, স্থানীয় বাজার এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের পরিস্থিতির মূল কারণ সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের ভেতরে ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের উজানে অব্যাহত বর্ষণ। এসব এলাকার নদীগুলোর পানি দ্রুত বাংলাদেশে প্রবেশ করায় স্বল্প সময়ের মধ্যে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি কিংবা তার ওপরে উঠে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আগেই জানিয়েছিল, জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় বন্যার ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে।
বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কৃষি খাতে। আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, মাছের ঘের এবং গবাদিপশুর খাদ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক আগাম ফসল রক্ষা করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী কয়েক দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং বর্তমানে ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোর পাশাপাশি নতুন এলাকাও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, উদ্ধার সরঞ্জাম মজুত, প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়; দীর্ঘমেয়াদে নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।
পূর্বের পোস্ট :