ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী যে সংখ্যক শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে তার চেয়ে প্রায় ৫৫ লাখ বেশি শিশুকে লক্ষ্য ধরা হয়েছে। একই বয়সী শিশুদের দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় বড় এই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।

তাদের মতে, হামের টিকাদান ক্যাম্পেইনের আগে তৃণমূল পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠ পর্যায়ের পরিকল্পনা বা ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ যথাযথভাবে করা সম্ভব হয়নি। এর কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে প্রকৃত টার্গেট শিশু সংখ্যা কম এসেছে বলে মনে করছেন তারা।

হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু করে। পরে ১২ এপ্রিল চার সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে একই বয়সী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। কর্মসূচি শেষ হয় ২০ মে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, হামের টিকাদান কর্মসূচিতে কাভারেজ দেখানো হয়েছে ১০৩ শতাংশ। টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৪ জন শিশু।

অন্যদিকে, রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারিত শিশুদের একটি করে ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। ছয় থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লাল রঙের ক্যাপসুল দেওয়া হবে।

কেন এত ব্যবধান

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একই বয়সী শিশুদের নিয়ে করা দুটি সরকারি কর্মসূচিতে এত বড় ব্যবধান থাকা স্বাভাবিক নয়। তাদের দাবি, হামের টিকা ক্যাম্পেইনের টার্গেট নির্ধারণে ঘাটতি থাকতে পারে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, টিকাদানের ক্ষেত্রে গ্যাভি মূলত পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসরণ করে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে শিশু সংখ্যা কিছুটা কম দেখানো হয়েছে, যার কারণে টিকাদান ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় ব্যবধান দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, এবার ইপিআইয়ের টিকাদান কর্মসূচিতেও ভালোভাবে ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ না হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস আলী বলেন, দেশের সব সিভিল সার্জনের কাছ থেকে শিশুদের তথ্য নিয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ইপিআই কেন্দ্র কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তা তার জানা নেই। তবে তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে শিশুদের তালিকা করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, এবার টার্গেট শিশু সংখ্যা কম হয়েছে। তাই সরকারি হিসাবে দেখানো টিকার কাভারেজ সঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন।

তার দাবি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচির শিশু সংখ্যার হিসাব ধরলে হামের টিকার কাভারেজ দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য ৯৫ শতাংশ কাভারেজ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

কাভারেজ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এত বড় ব্যবধানের কারণ হতে পারে—দেশের কিছু এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আওতায় আগেই হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, টিকার কাভারেজে ভুল হওয়ার কথা নয়, কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো টার্গেট শিশু সংখ্যা নির্ধারণে সহায়তা করে। তবে বিষয়টি আবারও যাচাই করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস দাবি করেছেন, হামের টিকার কাভারেজ ভালো হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে বলেও জানান তিনি।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার উপযুক্ত সব শিশু যদি টার্গেটের আওতায় না আসে, তাহলে কাভারেজের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। তাদের মতে, কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশের বেশি টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।